মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সবশেষ

খালে ভাসা স্যুটকেসে নারীর মরদেহ, এক কাগজে ধরা পুরো খুনি চক্র!

ভোরের সেই সময়টা ছিল নির্জন। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুর এলাকার গঙ্গাশ্রম অংশে খালের পাশে হঠাৎই একটি স্যুটকেস ভেসে থাকতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। শুরুতে সেটিকে সাধারণ কোনো পরিত্যক্ত ব্যাগ ভেবেছিল অনেকে। কিন্তু পুলিশ এসে স্যুটকেসটি উদ্ধার করে তীরে নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

ঢাকনা খোলার পর ভেতরে দেখা যায় একটি বড় বস্তা। সেই বস্তার মুখ খুলতেই বেরিয়ে আসে এক তরুণীর মরদেহ। দেহের পাশে রাখা ছিল কয়েকটি ইট। শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন থাকায় ঘটনাটি শুরুতেই হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধারণা করা হয়। তদন্তকারীদের প্রাথমিক মত ছিল, হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যেই এটিকে স্যুটকেসে ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর ভোরে। তবে তখন সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, নিহতের পরিচয়। কোনো কাগজপত্র বা পরিচয়পত্র পাওয়া যায়নি। মরদেহ শনাক্ত করতে পুলিশ দেশের বিভিন্ন থানার নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা যাচাই করেও কোনো মিল খুঁজে পায়নি। ফলে তদন্ত এক ধরনের অচলাবস্থায় পড়ে যায়। পরে মামলাটি হস্তান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন করে গভীর অনুসন্ধান।

অপ্রত্যাশিত সূত্র: স্যুটকেসের ভেতরের পুরোনো প্রেসক্রিপশন
তদন্ত চলাকালে স্যুটকেস ও বস্তার ভেতর পাওয়া কয়েকটি পুরোনো চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র (প্রেসক্রিপশন) প্রথমে খুব গুরুত্ব পায়নি। তবে এগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে থাকা নাম-ঠিকানা এবং কিছু চিকিৎসা তথ্য সম্ভাব্য একটি পরিচয়ের দিকে ইঙ্গিত করছে।

এই সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা ময়মনসিংহ শহরের একটি আবাসিক এলাকায় অনুসন্ধান শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা একটি ফ্ল্যাটে পৌঁছান, যেখানে সাবিনা নামের এক তরুণীর কাজের ইতিহাস পাওয়া যায়। এখান থেকেই পুরো ঘটনার রহস্যের দরজা খুলতে শুরু করে।

সাবিনা: নিখোঁজ নয়, বরং আড়ালে রাখা এক মৃত্যু
তদন্তে জানা যায়, নিহত তরুণীর নাম সাবিনা। বয়স ২১ বছর। তিনি ওই ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। বাসাটির মালিক ছিলেন আবুল খায়ের জাকির হোসেন এবং তার স্ত্রী রিফাত জেসমিন জেসি।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাবিনা দীর্ঘদিন ধরেই ওই বাসায় কর্মরত ছিলেন। তবে তার জীবন ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। তাকে নিয়মিত খাবার ঠিকমতো দেওয়া হতো না, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও ছিল নিয়ন্ত্রিত। কখনো কখনো তাকে ঘরের একটি কক্ষে আটকে রাখার অভিযোগও পাওয়া যায়।

৮ নভেম্বরের সকাল: যা থেকে শুরু ট্র্যাজেডি
তদন্তে উঠে আসে, ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর সকালে সাবিনা অসুস্থ থাকায় কাজে কিছুটা দেরি করেন। এতে ক্ষুব্ধ হন গৃহকর্ত্রী রিফাত জেসমিন জেসি। শুরু হয় বকাঝকা, যা দ্রুতই রূপ নেয় শারীরিক নির্যাতনে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রিফাত সাবিনাকে চুল ধরে টানাহেঁচড়া করেন এবং একপর্যায়ে দেয়ালে মাথা আঘাত করেন। গুরুতর আঘাতে সাবিনা অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।

ঘটনার সময় জাকির বাসায় ছিলেন না। পরে ফিরে এসে স্ত্রী রিফাতের কাছ থেকে পুরো ঘটনা জানার পর তারা দুজন মিলে ঘটনাটি গোপন করার সিদ্ধান্ত নেন।

মরদেহ গুমের পরিকল্পনা
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, মৃত্যুর পরই শুরু হয় মরদেহ গুমের পরিকল্পনা। প্রথমে মরদেহ একটি বস্তায় ভরা হয়। এরপর সেটিকে পানিতে ডুবিয়ে রাখার জন্য ভেতরে কয়েকটি ইট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, যাতে মরদেহ ভেসে না ওঠে বা সহজে খুঁজে পাওয়া না যায়।

এরপর সেই বস্তাটি একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরে ফেলা হয়। বাইরে থেকে এটি দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে ভেতরে একটি মরদেহ রয়েছে।

শেষ যাত্রা: লিফট, গাড়ি ও খাল
ঘটনার রাতে ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ভারী একটি স্যুটকেস লিফট দিয়ে নামানো হচ্ছে। পরে সেটি একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে তোলা হয়।

মোবাইল ফোনের অবস্থান বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন, গাড়িটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে গৌরীপুরের দিকে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গঙ্গাশ্রম এলাকার খালের কাছে পৌঁছে স্যুটকেসটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

খুনিদের ধারণা ছিল, স্যুটকেসটি পানিতে ডুবে গেলে এবং মরদেহ দ্রুত পচে গেলে কোনো প্রমাণ আর থাকবে না।

পরিবারকে বিভ্রান্ত করার কৌশল
তদন্তে আরও উঠে আসে, সাবিনার পরিবারকে পুরো সময়ই বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা যখন ফোন করতেন, তখন তাদের বলা হতো সাবিনা ভালো আছে, কাজ করছে।

কখনো দেখা করতে চাইলে নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হতো। এমনকি পরিবারের কাছে নিয়মিত কিছু অর্থও পাঠানো হতো, যাতে কোনো সন্দেহ তৈরি না হয়। এই কৌশলের কারণে দীর্ঘ সময় পরিবার বুঝতেই পারেনি যে সাবিনা আর বেঁচে নেই।

তদন্তে অগ্রগতি ও গ্রেপ্তার
প্রায় এক বছরের বেশি সময় তদন্তের পর পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ হাতে আসে পিবিআইয়ের। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল লোকেশন ডেটা এবং উদ্ধার হওয়া আলামতের মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় ঘটনার পুরো চিত্র।

এরপর ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী রিফাত জেসমিন জেসিকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে তারা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেয় বলে জানায় পিবিআই।

এক ভুলে ধরা পড়ে পুরো চক্র
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, পুরো ঘটনাটি গোপন করার জন্য খুনিরা সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি ছোট ভুলই তাদের ধরা পড়ার প্রধান সূত্র হয়ে ওঠে, স্যুটকেসের ভেতর পড়ে থাকা পুরোনো প্রেসক্রিপশন।

এই কাগজপত্রই পরে পরিচয় শনাক্তে সহায়তা করে এবং প্রযুক্তিগত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পুরো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *