চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশমুখী করতে নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। দেশটিতে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ উৎস চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের পথ সহজ হবে।
বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে চীনের ১২৫ জন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী অংশ নেন। আয়োজক ছিল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।
সেমিনারে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, শিল্পায়নের সুযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিদ্যমান সুবিধাগুলো তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন ব্যবসা ও শিল্প বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত এবং চীনের সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও শিল্প সহযোগিতা গড়ে তুলতে আগ্রহী। তিনি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ ও উৎপাদনভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ জোরদারে সরকার ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, সরকারি সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলছে। একইসঙ্গে চীনা উদ্যোক্তাদের জন্য সেবা ও যোগাযোগ সহজ করতে চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কী এই বিনিয়োগ কার্যালয়?
বিনিয়োগ কার্যালয় হলো কোনো দেশের বিনিয়োগ প্রচারকারী সংস্থার বিদেশে স্থাপিত একটি প্রতিনিধিত্বমূলক অফিস, যার প্রধান কাজ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের কার্যালয় বিডা বা সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার অধীনে পরিচালিত হতে পারে।
তবে এই কার্যালয় দূতাবাসের বিকল্প নয়; বরং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষায়িত সেবা ও তথ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
কীভাবে কাজ করবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ কার্যালয় চালু হলে এটি চীনা কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবে। পাশাপাশি শিল্প, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করবে।
এ ছাড়া আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক আয়োজন, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত নীতিগত ও প্রশাসনিক তথ্য প্রদান, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বিনিময় এবং বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
সম্ভাবনাময় প্রকল্প চিহ্নিত করে সরকারের কাছে সুপারিশও পাঠাতে পারে এই কার্যালয়। অর্থাৎ, এটি অনেকটা বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ ফ্যাসিলিটেশন সেন্টার’ হিসেবে কাজ করবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?
চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৈদেশিক বিনিয়োগকারী দেশ। ফলে সেখানে বাংলাদেশের একটি স্থায়ী বিনিয়োগ উপস্থিতি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিদেশে বিনিয়োগ প্রচার অফিস পরিচালনা করছে; সেই বিবেচনায় বাংলাদেশও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে। স্থানীয় পর্যায়ে একটি কার্যালয় থাকলে তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হবে এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কমতে পারে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তনের কারণে অনেক চীনা কোম্পানি নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। শ্রমশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাজার সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। নতুন কার্যালয় এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর সংযোগমাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু কার্যালয় খুললেই কি লক্ষ্য পূরণ হবে?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশে বিনিয়োগ কার্যালয় স্থাপন ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। দ্রুত সেবা প্রদান, নীতিগত স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত সুবিধা, জমির প্রাপ্যতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা না গেলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
তাই চীনে বিনিয়োগ কার্যালয় চালুর উদ্যোগকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশে কতটা কার্যকর ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যায় তার ওপর।








