দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় অর্জনের পর এবার সেই অর্থকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কাজে ব্যবহারের দাবি জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করাই নয়, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থকে লাভজনক বিনিয়োগের আওতায় আনতে দ্রুত রেমিট্যান্স বন্ড চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনশক্তি রফতানি-সংক্রান্ত নীতি প্রণয়নে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশে এসেছে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এটিই সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। পুরো অর্থবছরেই প্রতিটি মাসে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম টানা ছয় মাস, অর্থাৎ গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। ধারাবাহিকভাবে এত উচ্চ প্রবাহ এর আগে কখনও দেখা যায়নি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, হুন্ডির ব্যবহার কমে আসা এবং বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের দক্ষতা ও আয় বৃদ্ধির ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ রেমিট্যান্স বন্ড চালু করলে তারা নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন, একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বায়রার সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, সরকার যেহেতু প্রবাসীদের নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কথা বলছে, তাই তাদের জন্য রেমিট্যান্স বন্ড চালু করা উচিত। এতে প্রবাসীরা আরও উৎসাহিত হবেন এবং নিজেদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়িত বলে মনে করবেন।
তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিদেশি ঋণ পরিশোধ এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তারা এখনও প্রত্যাশিত স্বীকৃতি পান না। ভবিষ্যতে জনশক্তি রফতানি-সংক্রান্ত নীতি প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
শ্রমবাজার রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক মো. আতিকুর রহমান বিশ্বাস বলেন, শ্রমিক পাঠানোর নীতি তৈরির সময় ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করে সিদ্ধান্ত নিলে তার বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে। অন্যথায় অতীতের মতো অনেক উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন, বর্তমান সময়ই প্রবাসীদের জন্য আলাদা বিনিয়োগমুখী বন্ড চালুর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ বন্ড চালু করা গেলে তারা স্বেচ্ছায় সেখানে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হবে, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অংশগ্রহণও আরও দৃশ্যমান হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতেও রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং জনশক্তি রফতানি খাতকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।








