মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত করে ইরানের ক্ষমতায় বসতে চেয়েছিলেন আহমাদিনেজাদ!

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে কেন্দ্র করে এক চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এনেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাব্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করছিল এবং উপযুক্ত সময় এলে তাকে নতুন নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও বিবেচনায় ছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে আহমাদিনেজাদের অংশগ্রহণ ছিল মূলত একটি আড়াল। প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সেখানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা।

লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি জানান, হাঙ্গেরি সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা তাকে বিশেষভাবে আহমাদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর অনুরোধ করেছিলেন। পরে তাকে জানানো হয়, সম্মেলনটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা; এর আড়ালেই হবে গোপন বৈঠক। ডেলির ভাষায়, শত্রুপক্ষের দুই পক্ষ আলোচনায় বসতে চাইলে সে সুযোগ তৈরি করে দেওয়াই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কয়েক বছর ধরে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চালায়। এমনকি ২০২৪ সালে মোসাদপ্রধান ডেভিড বারনিয়া নিজেই বুদাপেস্টে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকেও অবহিত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আহমাদিনেজাদের বিদেশ সফর ও কিছু ব্যয়ও গোপনে বহন করেছে ইসরায়েল। বিদেশে বিভিন্ন সফরের সময় একাধিকবার তাঁর সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের বৈঠক হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের হামলার পর পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, তেহরানে কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকা আহমাদিনেজাদকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার একটি অভিযান পরিচালনা করে মোসাদ। উদ্দেশ্য ছিল, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে তাকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে সামনে আনা।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানের পর আহমাদিনেজাদ নিজেই পুরো পরিকল্পনা নিয়ে সংশয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হলেও ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দাবি, ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে বর্তমানে তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে গৃহবন্দী রয়েছেন।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ইরানে সরকার পরিবর্তনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তর ইরাকে অবস্থানরত কুর্দি যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে প্রবেশ করানোর পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়নের আগেই থেমে যায়।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির হাইমান সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে কয়েকটি ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ বিশেষ অভিযান পরিকল্পনায় ছিল এবং আহমাদিনেজাদও সেই পরিকল্পনার একটি অংশ ছিলেন।

২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। সে সময় তিনি ইসরায়েলবিরোধী কঠোর অবস্থান, পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া এবং বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত ছিলেন। তবে ক্ষমতা ছাড়ার পর তার রাজনৈতিক অবস্থান ও জনসমক্ষে উপস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নীতির সমালোচনা, দুর্নীতির অভিযোগ, তুলনামূলক সংযত বক্তব্য এবং নতুন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তাকে আগের অবস্থান থেকে আলাদা করে তোলে।

আহমাদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবদোলরেজা দাভারি দাবি করেন, অর্থ নয়, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ফেরার আকাঙ্ক্ষাই তাকে এমন কোনো উদ্যোগে আগ্রহী করতে পারে। অন্যদিকে, তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ভাষ্যমতে, তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না পাওয়ার পর বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারান আহমাদিনেজাদ এবং বিদেশি সহায়তায় ভবিষ্যতে ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও তিনি ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।

তবে এসব তথ্যের বেশিরভাগই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত। ইসরায়েল, ইরান বা মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *