রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তার বক্তব্য, নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো প্রার্থীকে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়ে যাবে।
মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
আগামী ২০ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হবে। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে। ভোট গ্রহণ হবে সংসদকক্ষে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মহলে নানা মত থাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন চিফ হুইপ। জবাবে তিনি বলেন, সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদ এখনো কার্যকর। ফলে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ সংসদ সদস্যদের নেই।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দলীয় প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দল থেকে পদত্যাগ করলে তার আসন শূন্য হয়। একইভাবে সংসদে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও আসন হারানোর বিধান রয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই বিধান কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। এবার নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যেই বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।
যেভাবে হবে ভোট
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, আগামী ২০ আগস্ট সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট নেওয়া হবে। সংসদ সদস্যরা তাদের বিভক্তিসংখ্যা অনুযায়ী ভোট দেবেন।
রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ভোট দেওয়ার সময় তা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ভোট গণনা থেকে শুরু করে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াও টেলিভিশনে সরাসরি দেখানো হবে।
এদিকে বিএনপির প্রার্থী সম্পর্কে জানতে চাইলে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেই সবাই বিষয়টি জানতে পারবেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়ও প্রার্থীর নাম জানা যাবে বলে জানান তিনি।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে। বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে দলীয় সূত্রের দাবি, বিএনপির পক্ষ থেকে মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করা হচ্ছে।
বিএনপি ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী বৃহস্পতিবার।
‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হতে দিতে চাই না’
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতেই তারা প্রার্থী দিয়েছেন। তাদের দৃষ্টিতে তাদের প্রার্থী বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে প্রক্রিয়াটি আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারত। গণভোটের ফল সংস্কারের পক্ষে যাওয়ায় ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা সম্ভব ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, তা হলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরও বেশি সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পেতেন। তবে বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় তারা সেটিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হতে দিতে চান না। এ কারণেই অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে। এনসিপি ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক।
নির্বাচনের প্রস্তুতিতে বৈঠক
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং হুইপ জি কে গউছ, রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, আখতারুজ্জামান মিয়া ও এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়া এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদও সভায় ছিলেন।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংসদের অধিবেশনকক্ষ ব্যবহার, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সভায় আলোচনা করা হয়। নির্বাচন ঘিরে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নির্বাচনী কর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। তার তত্ত্বাবধানেই ভোট গ্রহণ হবে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ জাতীয় সংসদের সব সদস্য এই নির্বাচনে ভোটার হিসেবে বিবেচিত হবেন।
২০ আগস্টের ভোটকে সামনে রেখে একদিকে যেমন নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে, অন্যদিকে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ আছে কি না, ৭০ অনুচ্ছেদকে ঘিরে সেই প্রশ্নও নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে।








