শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

চট্টগ্রামের আকাশপথে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ, ২০৭০ সালে কোটি যাত্রীর লক্ষ্য

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আগামী কয়েক দশকের জন্য বড় পরিসরে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৭০ সালের মধ্যে বছরে ১ কোটি যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করছে কর্তৃপক্ষ। পরিকল্পনায় রানওয়ে সম্প্রসারণ, উড়োজাহাজ রাখার জায়গা বৃদ্ধি, নতুন লাউঞ্জ ও একাধিক বোর্ডিং ব্রিজ নির্মাণের মতো বিষয় রাখা হয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ এখনো খুব বেশি এগোয়নি। ২০২৫ সালে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় এখন পর্যন্ত এর প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সক্ষমতার চেয়ে বেশি চাপ
শাহ আমানত বিমানবন্দরের বর্তমান অবকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। নির্ধারিত সক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রায় ছয় বছর পরও যাত্রী ও ফ্লাইটের চাপ সামলাতে হচ্ছে বিমানবন্দরটিকে।

জাপানি দাতা সংস্থা জাইকার উদ্যোগে প্রায় ২৬ বছর আগে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদা পায় শাহ আমানত। এরপর অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়বের মতে, দুই দশক আগের তুলনায় বিমানবন্দরের প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থায় পরিবর্তন এলেও এখন আরও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে রাডার ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ স্থাপনা ও যাত্রী স্ক্যানিংয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। পর্যাপ্ত বোর্ডিং ব্রিজ না থাকায় যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

বর্তমানে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শাহ আমানত বিমানবন্দরে বছরে গড়ে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার আন্তর্জাতিক ও ১২ হাজার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ওঠানামা করে। এ বিমানবন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন।

তিন ধাপে কোটি যাত্রীর সক্ষমতা
মাস্টারপ্ল্যানে আগামী ৪৪ বছরে ধাপে ধাপে বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে ৫০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ১৫ বছরে এই সক্ষমতার সঙ্গে আরও ২০ লাখ যাত্রী যুক্ত করা হবে। এরপর ২০৭০ সালের মধ্যে আরও ৩০ লাখ যাত্রীর সক্ষমতা যোগ করে মোট বার্ষিক ধারণক্ষমতা ১ কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন অ্যারাইভাল ও ডিপারচার লাউঞ্জ নির্মাণের পাশাপাশি একাধিক বোর্ডিং ব্রিজ তৈরি করা হবে। বাড়ানো হবে উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের জায়গাও। রানওয়ের সম্প্রসারণের বিষয়টিও রয়েছে মাস্টারপ্ল্যানে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আশা, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘ সময়ের জন্য নতুন করে বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে না। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর জানান, জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠান মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ করছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় কাজের গতি বাড়বে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়েও আশাবাদী তারা।

ট্যারিফ নিয়ে আপত্তি ব্যবসায়ীদের
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিমানবন্দরের ট্যারিফ নিয়েও আপত্তি রয়েছে ব্যবসায়ী মহলের। তাদের অভিযোগ, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সমপরিমাণ ট্যারিফ নেওয়া হলেও শাহ আমানতে একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে স্বতন্ত্র কার্গো ভিলেজ এখনো চালু না হওয়ায় সম্ভাবনার তুলনায় বিমানবন্দরটির ব্যবহার সীমিত রয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হকের মতে, একই হারে ট্যারিফ আদায় করায় অনেক এয়ারলাইনস চট্টগ্রামে ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ দেখায় না। তাঁর পরামর্শ, ট্যারিফ কমানোর পাশাপাশি কার্গো ভিলেজসহ বিদ্যমান সুবিধাগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন এয়ারলাইনসকে আকৃষ্ট করতে হবে।

শুধু বাজেট বা দেশীয় এয়ারলাইনসের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক বড় এয়ারলাইনসগুলোকেও চট্টগ্রামে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক আকতার পারভেজ বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে কম ভাড়ার এয়ারলাইনস পরিচালনার সুযোগের পাশাপাশি বিজনেস ক্লাসের যাত্রীদের চাহিদাকেও পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

বন্দরনগরীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ
শাহ আমানত বিমানবন্দরের অন্যতম বড় সুবিধা এর ভৌগোলিক অবস্থান। বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব মাত্র প্রায় এক কিলোমিটার। ফলে বিমানবন্দরটির সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে নগরীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো জরুরি। অবকাঠামো সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তি, কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস আকর্ষণের উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে শাহ আমানত বিমানবন্দর শুধু যাত্রী পরিবহনের কেন্দ্র নয়, চট্টগ্রামকে আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক বন্দরনগরীতে পরিণত করার অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *