কাজের আশায় দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দুই বাংলাদেশি। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় দফায় দফায় বন্দি রাখা হয় তাদের। শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার পেনাং রাজ্যের একটি রিফিউজি ক্লিনিকের সামনে ফেলে রেখে যায় মানবপাচারকারী চক্র।
উদ্ধার হওয়া দুজনের একজন নড়াইলের লরাগাতি উপজেলার অটোচালক জনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসে বিমানবন্দর এলাকায় এক দালালের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ভালো কাজের আশ্বাস দিয়ে তাকে নেওয়া হয় কক্সবাজারের টেকনাফে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার অনিশ্চিত যাত্রা।
মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে এক রাতে জোর করে জনিসহ কয়েকজনকে নৌকায় তুলে দেয় পাচারকারীরা। প্রায় ১০ দিন সমুদ্রপথে চলার পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় থাইল্যান্ডে। সেখানে একটি বন্দিশিবিরে প্রায় চার মাস আটকে রেখে চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। নির্যাতনের কারণে একপর্যায়ে তাদের হাত-পায়ে পচন ধরে যায়।
শুধু নির্যাতন করেই থেমে থাকেনি পাচারকারীরা। বন্দিদের ওপর চালানো নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হতো। জনির বাবা মো. ফুরকান দিনমজুর হওয়ায় সেই অর্থ জোগাড় করতে পারেননি। টাকা দিতে না পারায় ছেলের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ানো হয়।
থাইল্যান্ডের বন্দিশিবির থেকে পরে অবৈধ পথে তাদের মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে আরও প্রায় দুই মাস আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়।
একই চক্রের হাতে পাচারের শিকার হন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মো. মোশাররফ হোসেন। মালয়েশিয়ার বন্দিশিবিরে থাকা অন্যরা মুক্তিপণের টাকা দিয়ে একে একে বেরিয়ে গেলেও অর্থ দিতে না পারায় জনি ও মোশাররফের মুক্তি মেলেনি। এরপর গত ২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় পেনাং রাজ্যের একটি রিফিউজি ক্লিনিকের সামনে তাদের ফেলে রেখে যায় পাচারকারী চক্র।
পরে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশনকে জানায়। খবর পেয়ে হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। দূতাবাসের অথরাইজেশন লেটারের মাধ্যমে স্থানীয় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেনের তত্ত্বাবধানে রাখা হয় দুই বাংলাদেশিকে।
প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সার্বিক সহযোগিতায় চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
বন্ধ শ্রমবাজারের সুযোগ নিচ্ছে পাচারকারী চক্র
বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকলেও দেশটিতে বাংলাদেশিদের পাচার থামেনি। কাজের প্রলোভন দেখিয়ে কখনও ভ্রমণ ভিসায়, আবার কখনও কক্সবাজার থেকে নৌপথে থাইল্যান্ড হয়ে বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে।
থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র। দুর্গম বনাঞ্চল ও পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় ঢোকানো হচ্ছে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ বৈধ অভিবাসনের নিয়ম ও নিরাপদ বিদেশযাত্রা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় দালালদের কথায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ান। বিদেশে যাওয়ার আশায় কেউ ভিটেমাটি বিক্রি করেন, কেউ আবার চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দালালদের টাকা দেন। পরে স্বজনের কোনো খোঁজ না পেয়ে অনেক পরিবারকে আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হয়।
সীমান্তের দুই পাশে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানবপাচার ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, পাচারকারী ও দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা এবং তৃণমূল পর্যায়ে বৈধ অভিবাসন সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।








