রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

আন্দোলনে শাস্তি, রাষ্ট্রপতির আদেশে ছাড় পেলেন এনবিআরের ২০ কর্মকর্তা

রাজস্ব খাতের সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিয়ে শাস্তির মুখে পড়েছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০ কর্মকর্তা। কারও বিরুদ্ধে বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ, কেউ ছিলেন আন্দোলনের সংগঠক, আবার কেউ দপ্তরের কার্যক্রম বন্ধ রেখে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের ওপর নেমে এসেছিল সাময়িক বরখাস্ত থেকে বেতন গ্রেড অবনমনের মতো শাস্তি। এবার সেই দণ্ডই মওকুফ করলেন রাষ্ট্রপতি।

মার্জনা চেয়ে করা আপিল আবেদন গ্রহণ করে এসব কর্মকর্তার দণ্ডাদেশ বাতিলের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন ইতোমধ্যে জারি করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)।

রাষ্ট্রপতির আদেশে শাস্তি বাতিল হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন কমিশনার জাকির হোসেন (চলতি দায়িত্বে), অতিরিক্ত কর কমিশনার হাছান তারেক রিকাবদার, মির্জা আশিক রানা, চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী, সুলতানা হাবীব, মুরাদ আহমেদ, সিফাত ই মরিয়ন, আ আ আমীমুল ইহসান, সাধন কুমার কুণ্ডু, যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন, মামুন মিয়া, মাসুমা খাতুন, মোরশেদ উদ্দীন খান, সানোয়ারুল কবির, উপ কর কমিশনার জিল্লুর রহমান, ইমাম তৌহিদ হোসেন, সাইদুল ইসলাম, শাহাদাৎ জামিল, রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া ও শফিউল বশর।

যে আন্দোলন থামিয়ে দিয়েছিল রাজস্ব আদায়
ঘটনাটির সূত্রপাত ২০২৫ সালের মে মাসে। ওই বছরের ১২ মে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারির পর এর বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

প্রায় দেড় মাস ধরে চলা সেই আন্দোলন জুনের শেষ দিকে গিয়ে তীব্র আকার নেয়। দেশের শুল্ক ও কর কার্যালয়গুলোতে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থবছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়েই কয়েক দিন রাজধানীর এনবিআরসহ সারাদেশের শুল্ক-কর কার্যালয়ে কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

এনবিআরের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি আগে ঘটেনি বলে তখন আলোচনায় আসে।

শুধু অবস্থান কর্মসূচি নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল-সমাবেশও করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে রাজস্ব প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

একপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন স্থগিত করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু আন্দোলন থামলেও এর রেশ থেকে যায় এনবিআরের প্রশাসনিক ব্যবস্থায়।

বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলা থেকেই শাস্তির সূত্রপাত
আন্দোলনের সময় বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছিল। প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের কেউ কেউ সেই বদলির আদেশ প্রকাশ্যেই ছিঁড়ে ফেলেন।

সরকারি চাকরির আচরণবিধি অনুযায়ী এমন কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার ৩০এ বিধি লঙ্ঘন এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এটিকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

আন্দোলনে কেউ সংগঠকের ভূমিকায় ছিলেন, আবার কেউ নিজ নিজ দপ্তরের কার্যক্রম বন্ধ রেখে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়।

তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ধরনের দণ্ড দেওয়া হয়। শাস্তির ধরনও ছিল ভিন্ন, কাউকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, কারও বেতন গ্রেড অবনমন করা হয়।

এবার সেই দণ্ডই থাকল না
শাস্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মার্জনা চেয়ে আপিল করেন। তাদের আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে গেলে তা মঞ্জুর করা হয়।

আইআরডির প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আপিল আবেদন মঞ্জুর করে রাষ্ট্রপতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দণ্ডাদেশ বাতিলের আদেশ দিয়েছেন।

অর্থাৎ, যে আন্দোলনের কারণে একসময় এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেই শাস্তির অধ্যায় আপাতত শেষ হলো রাষ্ট্রপতির দণ্ড মওকুফের আদেশে।

আন্দোলনের প্রভাব ছিল রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও
২০২৫ সালের ওই আন্দোলন শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। অর্থবছরের শেষ সময়ে শুল্ক-কর কার্যালয়গুলোতে কাজ বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায় নিয়ে তৈরি হয়েছিল উদ্বেগ।

প্রায় দেড় মাসের কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে যখন দেশের বিভিন্ন শুল্ক-কর কার্যালয়ে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তখন কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজস্ব প্রশাসনের একটি বড় অংশ।

শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন স্থগিত হলেও এর পরের প্রশাসনিক পদক্ষেপে শাস্তি, বদলি ও বরখাস্তের মতো সিদ্ধান্ত আসে।

এখন রাষ্ট্রপতির আদেশে ২০ কর্মকর্তার সেই দণ্ড বাতিল হওয়ায় আন্দোলন-পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি বড় অংশ নতুন মোড় নিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *