প্রবাসে সাফল্যের গল্পে বড় পুঁজি, দ্রুত বিস্তার কিংবা রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্পই বেশি শোনা যায়। আল-আমিনের গল্পটি তার বিপরীত। একটি ছোট দোকান দিয়ে শুরু করে প্রায় দুই দশক ধরে ধাপে ধাপে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন তিনি। মালয়েশিয়া থেকে পর্তুগাল, এরপর স্পেন, দেশ বদলেছে, বাজার বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্য। আজ মাদ্রিদের ফলমূল ও খাদ্যপণ্যের বাজারে তার প্রতিষ্ঠান ‘Dhaka Frutas’ প্রায় ৮০টি দোকানের সঙ্গে যুক্ত।
প্রবাসজীবনের ১৯ বছর পেরিয়ে আল-আমিনের এই অবস্থানে পৌঁছানোকে শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণের হিসাব দিয়ে দেখা যায় না। এর পেছনে আছে নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়া, বাজার বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সম্পর্ক তৈরি করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার অভিজ্ঞতা।
শুরুটা ছিল একেবারেই ছোট
ব্যবসায় নামার সময় আল-আমিনের হাতে ছিল না বড় কোনো পুঁজি কিংবা প্রস্তুত বাজার। ছিল সীমিত সামর্থ্য আর নিজের কিছু করার ইচ্ছা।
ফলমূল ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসা দিয়েই শুরু করেন। ক্রেতারা কী চান, কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, কীভাবে নিয়মিত ক্রেতার আস্থা ধরে রাখা যায়, এসব বুঝতে বুঝতেই ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিসর বাড়ান তিনি।
২০০৮ সালে শুরু হয় Dhaka Frutas Y Verduras Alimentacion SL-এর কার্যক্রম। ফল, সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য, বিপণন ও বিতরণকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এগোতে থাকে।
ছোট উদ্যোগটি একসময় বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় ৮০টি দোকানের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত আল-আমিনের প্রতিষ্ঠান।
‘স্বপ্নকে কাজে পরিণত করতে হয়’
দীর্ঘ এই পথচলায় আল-আমিনের কাছে একটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, স্বপ্নের সঙ্গে দায়িত্ববোধের সম্পর্ক। তিনি বলেন, “শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না। নিজের একটি লক্ষ্য ঠিক করতে হবে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।”
তার মতে, সাফল্যের জন্য প্রতিদিনের কাজটিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। লক্ষ্য ঠিক রেখে ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারলে একসময় সাফল্য আসবেই।
তার নিজের জীবনও যেন সেই ধারণারই বাস্তব উদাহরণ। দ্রুত বড় হওয়ার চেষ্টা না করে সময় নিয়ে ব্যবসার ভিত শক্ত করেছেন তিনি।
মাদ্রিদে বাংলাদেশি উদ্যোক্তার পরিচিতি
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের ব্যবসায়িক পরিবেশে একজন অভিবাসী উদ্যোক্তার জন্য পথ তৈরি করা সহজ ছিল না। নতুন ভাষা, সংস্কৃতি, ব্যবসায়িক নিয়ম এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
সেই বাস্তবতার মধ্যেই ‘Dhaka Frutas’ নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
২০২৬ সালে স্পেনের সংবাদপত্র El País মাদ্রিদের অভিবাসী উদ্যোক্তাদের ফলমূল ব্যবসা নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ‘Dhaka Frutas’-এর নাম উল্লেখ করে। আল-আমিনের জন্য এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বীকৃতি নয়; প্রবাসে বাংলাদেশিদের উদ্যোক্তা হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনারও একটি উদাহরণ।
সাফল্যের পেছনে একা ছিলেন না
ব্যবসা বড় হলেও আল-আমিন নিজের সাফল্যকে কখনো একার অর্জন হিসেবে দেখেন না। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকা মানুষদের অবদানকে তিনি গুরুত্ব দেন।
তার বিশ্বাস, একজন উদ্যোক্তার সাফলনের পেছনে অনেক মানুষের অবদান থাকে। বিশেষ করে দুঃসময়ে যারা পাশে থাকেন, সুসময়েও তাদের মনে রাখা উচিত।
এই ভাবনা থেকেই প্রতিবছর বিশেষ আয়োজনে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে সময় কাটান তিনি। ব্যবসার ব্যস্ততার বাইরে এসব আয়োজন তার কাছে সম্পর্কের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও সুযোগ।
ব্যবসায় পরিবারের অংশীদারিত্ব
আল-আমিনের উদ্যোক্তা জীবনে পরিবারের সহযোগিতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তার সহোদর আবু বকর দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার কঠিন সময় থেকে এগিয়ে যাওয়ার পথে পাশে ছিলেন। এই পারিবারিক অংশীদারিত্ব শুধু ব্যক্তিগত সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বেও এর প্রতিফলন রয়েছে।
২০২১ সালে আল-আমিন প্রশাসকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর আবু বকর প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসকের দায়িত্ব নেন।
ফলে ‘Dhaka Frutas’-এর গল্পটি কেবল একজন প্রবাসীর ব্যবসা গড়ে তোলার গল্প নয়; পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতায় একটি উদ্যোগকে দীর্ঘ সময় ধরে এগিয়ে নেওয়ার গল্পও।
তরুণদের জন্য অভিজ্ঞতার পাঠ
প্রবাসে এসে ব্যবসা করার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। কিন্তু আল-আমিনের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু পুঁজি থাকলেই ব্যবসায় টিকে থাকা যায় না।
তার মতে, আগে লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। এরপর সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করতে হবে। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করতে হবে।
১৯ বছরের প্রবাসজীবন থেকে তার উপলব্ধি, ব্যবসায় সাফল্যের জন্য অর্থের পাশাপাশি সততা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
সংখ্যার আড়ালে ১৯ বছরের গল্প
মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু, এরপর পর্তুগাল, সবশেষে স্পেনের মাদ্রিদ। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আল-আমিনকে বারবার নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
একটি ছোট দোকান থেকে আজ প্রায় ৮০টি দোকানের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়িক পরিসরে এই পরিবর্তন তাই শুধু ব্যবসার আকার বড় হওয়ার হিসাব নয়।
এর মধ্যে আছে ১৯ বছরের শ্রম, ঝুঁকি নেওয়া, ব্যর্থতা থেকে শেখা, অপেক্ষা এবং আবার নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা।
আল-আমিনের গল্পের সবচেয়ে বড় দিক সম্ভবত এখানেই প্রবাসে বাংলাদেশির পরিচয় শুধু কর্মী কিংবা শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুযোগ তৈরি হলে একজন বাংলাদেশিও স্থানীয় বাজারে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের জায়গা করে নিতে পারেন।
একটি দোকান থেকে ৮০টি দোকানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠা সেই যাত্রা তাই শেষ পর্যন্ত শুধু আল-আমিনের ব্যবসার বিস্তারের গল্প নয়; এটি দেখায়, প্রবাসে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে কখনো কখনো সবচেয়ে বড় পুঁজি হয় ধৈর্য, মানুষের আস্থা এবং লক্ষ্য থেকে না সরা।








