রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

কুয়েতে বাংলাদেশী শিশুদের স্কুল-সংকট: প্রবাসীদের আয় আছে, সন্তানের শিক্ষার নিশ্চয়তা নেই

সাড়ে তিন লাখের বেশি বাংলাদেশির বসবাস কুয়েতে। তাদের ঘামে দেশে আসে রেমিট্যান্স, চলে পরিবারের সংসার। কিন্তু প্রবাসে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সেই পরিবারগুলোর দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কারণ কুয়েতে দীর্ঘদিনেও গড়ে ওঠেনি একটি স্থায়ী বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে একদিকে চড়া খরচে বিদেশি স্কুলে সন্তানদের পড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি ও জাতীয় শিক্ষাক্রম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

কুয়েতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সেই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের সন্তানদের জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় এখন প্রশ্ন উঠছে, প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশুদের শিক্ষার ভবিষ্যৎ আসলে কোথায়?

স্কুল বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা নেই, আছে বাধ্যবাধকতা
কুয়েতে বাংলাদেশি শিশুদের জন্য বড় কোনো স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় অভিভাবকদের বিকল্প হিসেবে বেছে নিতে হচ্ছে ভারতীয়, পাকিস্তানি, ফিলিপিনো, স্থানীয় কুয়েতি কিংবা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল।

সমস্যা শুধু স্কুল পাওয়াতেই শেষ হচ্ছে না। ভিন্ন দেশের কারিকুলামে পড়তে গিয়ে শিশুদের পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের দূরত্বও বাড়ছে।

প্রবাসে জন্ম নেওয়া অনেক শিশু বাংলা বলতে বা লিখতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছে। ফলে যে প্রজন্মকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও প্রবাস, দুই সমাজের সঙ্গে সংযোগ রেখে বেড়ে ওঠার কথা, তাদের একটি অংশ শৈশবেই নিজের শেকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

সন্তান পড়াতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে
কুয়েতের বিদেশি স্কুলগুলোর টিউশন ফি ও অন্যান্য খরচও সাধারণ প্রবাসীদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কুয়েতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ সীমিত আয়ের চাকরিজীবী কিংবা শ্রমিক। পরিবারের খরচ, দেশে অর্থ পাঠানো এবং নিজেদের জীবনযাপনের ব্যয়ের পাশাপাশি সন্তানের উচ্চ স্কুল ফি বহন করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

ফলে সন্তানদের ভালো শিক্ষার ব্যবস্থা করতে গিয়ে অনেক পরিবারকে আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে শিক্ষার পেছনে।

একজন দীর্ঘদিনের প্রবাসী অভিভাবকের আক্ষেপ, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য তারা কঠোর পরিশ্রম করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। অথচ নিজেদের সন্তানদের মাতৃভাষায় পড়ানোর সুযোগটুকুও নেই। অন্য দেশের স্কুলে পড়াতে গিয়ে একদিকে বাড়ছে খরচ, অন্যদিকে সন্তানদের বাংলাদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে।

স্কুল আছে, কিন্তু জায়গা নেই
বিদেশি স্কুলে ভর্তি করানোই যে সমস্যার সমাধান, তাও নয়। কুয়েতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসনসংকট ও ভর্তি জট নিয়মিত সমস্যা।

চাহিদার তুলনায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সীমিত হওয়ায় প্রতিবছর অনেক বাংলাদেশি শিশুকে ভর্তি করাতে গিয়ে অভিভাবকদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কারও ক্ষেত্রে ভর্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, আবার কেউ নির্দিষ্ট সময়ে কোনো স্কুলে আসন না পেয়ে দীর্ঘ সময় পড়াশোনার বাইরে থাকে।

শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরুতেই এমন অনিশ্চয়তা তার মানসিক ও সামাজিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশে ফিরলেও তৈরি হয় নতুন সংকট
কুয়েতে ভিন্ন কারিকুলামে পড়া শিশুরা যখন পরবর্তীতে বাংলাদেশে ফিরে আসে, তখন সমস্যাটি নতুন রূপ নেয়।

জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে তাদের পড়াশোনার মিল না থাকায় দেশের মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হতে অনেকেরই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় ভিন্ন কারিকুলামে শেষ করে দেশে ফিরে উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমানের পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে গিয়ে তৈরি হয় বড় ধরনের শিক্ষাগত ব্যবধান।

অর্থাৎ কুয়েতে থাকলে এক ধরনের সংকট, দেশে ফিরলেও আরেক ধরনের মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা বাস্তবতার মাঝেই বেড়ে উঠছে অনেক প্রবাসী পরিবারের সন্তান।

একসময় দূতাবাসের স্কুল ছিল, এখন স্থায়ী সমাধান নেই
কুয়েতে একসময় বাংলাদেশ দূতাবাস পরিচালিত একটি স্কুল ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমোদনসংক্রান্ত সমস্যা ও আইনি জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

এরপর থেকে একটি স্থায়ী বাংলাদেশি স্কুলের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলেও এখনো সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি।

প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস মিললেও স্থায়ী অবকাঠামো ও ক্যাম্পাস তৈরির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।

বাধা শুধু অর্থের নয়, আইনি কাঠামোরও
কুয়েতে বিদেশি স্কুল পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন ও অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য বড় জায়গা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং স্থানীয় স্পন্সরের আইনি অনুমোদনসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়।

ফলে প্রবাসীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সহজ নয়। প্রয়োজন হয় সরকারের উদ্যোগ, কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ।

এ কারণেই প্রবাসীদের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, বাংলাদেশ সরকারকে কুয়েত সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ বের করতে হবে।

কেমন স্কুল চান প্রবাসীরা?
প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ দূতাবাসের সরাসরি তত্ত্বাবধানে অথবা কুয়েত সরকারের সহযোগিতায় একটি স্থায়ী ভবন ও ক্যাম্পাস বরাদ্দ করা হোক।

সেখানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (NCTB) অনুমোদিত পাঠ্যক্রম কিংবা আন্তর্জাতিক মানের বাংলা কারিকুলাম চালু করার দাবি রয়েছে। এতে শিশুরা বিদেশে থেকেও বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পাবে।

এটি শুধু একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার দাবি নয়, প্রবাসী পরিবারের দৃষ্টিতে এটি সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার প্রশ্ন।

‘একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে’
কুয়েতে বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আ.হ জুবেদ মনে করেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের এই দাবি এখন বাস্তবায়নের সময় এসেছে।

তিনি বলেন, শিক্ষার মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া। কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিষয়টি নিয়মিতভাবে আলোচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তার প্রত্যাশা, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের এই সংকটের সমাধান সম্ভব।

প্রশ্নটা শুধু আজকের নয়
কুয়েতে সাড়ে তিন লাখের বেশি বাংলাদেশির বসবাস। তাদের অনেকের সন্তান এই দেশেই জন্ম নিচ্ছে, এখানেই বেড়ে উঠছে। ফলে শিক্ষা সংকটটি সাময়িক কোনো সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি প্রজন্মগত প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে।

আজ যে শিশু বিদেশি কারিকুলামে পড়ছে, আগামী দিনে তার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা দৃঢ় থাকবে, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে এখন কী ধরনের শিক্ষা-ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে তার ওপর।

প্রবাসীরা তাই শুধু একটি স্কুল চান না। তারা চান, কুয়েতে জন্ম নেওয়া একটি বাংলাদেশি শিশু যেন বিদেশের মাটিতে থেকেও নিজের ভাষায় পড়তে পারে, নিজের দেশের ইতিহাস জানতে পারে এবং প্রয়োজন হলে দেশে ফিরে কোনো শিক্ষাগত দেয়ালের মুখে না পড়ে।

কুয়েতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘ উপস্থিতির পরও যদি সেই প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষার ঠিকানা তৈরি না হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান আমরা কতটা স্বীকার করি, আর তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনকে কতটা গুরুত্ব দিই?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *