রাজবাড়ীর পাংশায় কাতারপ্রবাসীর স্ত্রী রুনা খাতুন (৩০) হত্যা মামলায় মিলন শেখ (২৭) নামে এক আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে আরও এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাকে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে রাজবাড়ীর বিশেষ দায়রা জজ মো. ইউসুফ হোসেন এ রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় মিলন শেখ আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
মিলন পাংশা উপজেলার পাট্টা ইউনিয়নের মুছিদাহ খামারডাঙ্গী গ্রামের খলিল শেখের ছেলে। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাজবাড়ীর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. আইয়ুব আলী খান।
গভীর রাতে মায়ের নিথর দেহ দেখেছিল শিশু
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট রাতে কাতারপ্রবাসী আনিছুর রহমানের স্ত্রী রুনা খাতুন দুই সন্তানকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত দেড়টার দিকে রুনার দেড় বছর বয়সী ছোট সন্তান কান্না শুরু করলে তার ১০ বছর বয়সী মেয়ে উম্মে সিনহার ঘুম ভেঙে যায়।
ঘুম থেকে উঠে মাকে বিছানায় না পেয়ে সে বাইরে বের হয়। বারান্দায় গিয়ে প্রতিবেশী মিলন শেখকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিশুটি। এরপর উঠানে গিয়ে রুনাকে পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার শুরু করে সে।
শিশুটির চিৎকারের পর মিলনসহ আরও দুই ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে প্রতিবেশীরা এসে রুনাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরদিন সকালে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।
ছিনতাই হওয়া মোবাইল উদ্ধারের দাবি পুলিশের
রুনা হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই মো. রায়হান শেখ বাদী হয়ে পাংশা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলাটি পেনাল কোডের ৩০২, ৩৯৪ ও ৩৪ ধারায় করা হয়।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ মিলন শেখকে গ্রেপ্তার করে। একই মামলায় তেছেম সরদার (১৬) ও রিয়াজ জোয়াদ্দর (১৫) নামে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের কাছ থেকে রুনার ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে তেছেম ও রিয়াজ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের বিচার আলাদা আদালতে স্থানান্তর করা হয়। তাদের বিচার বর্তমানে নারী ও শিশু আদালতে চলছে।
১৮ জনের সাক্ষ্য, মিলনের সাজা
রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. আইয়ুব আলী খান জানান, মিলনের বিরুদ্ধে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছে। সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এই রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রায়ে অসন্তুষ্ট আসামিপক্ষ
তবে আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট নয় আসামিপক্ষ। মিলনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নাজমুল হাসান দাবি করেন, তার মক্কেল নির্দোষ এবং পুলিশের নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
আইনজীবীর ভাষ্য, ওই জবানবন্দির ভিত্তিতেই আদালত মিলনকে সাজা দিয়েছেন। রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত হাইকোর্টে আপিল করা হবে বলেও জানান তিনি।
মামলায় মিলনের সাজা হলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই আসামির বিচার এখনো নারী ও শিশু আদালতে চলমান রয়েছে।








