সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

সালমানের স্টুডিও কি আসল টার্গেট, নাকি অন্য কিছু, নেপথ্যে কী?

রাজধানীর দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রোপার্টিজের ভেতরে শনিবার গভীর রাতে যে তাণ্ডব হয়েছে, তার সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষত সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে। ভাঙা দরজা, কেটে দেওয়া সিসিটিভির তার, ছড়িয়ে থাকা কাচ, নষ্ট হয়ে যাওয়া ক্যামেরা-লাইট এবং তছনছ হয়ে যাওয়া আসবাবসহ কয়েক ঘণ্টার হামলায় স্টুডিওটি কার্যত লণ্ডভণ্ড।

কিন্তু ঘটনাস্থল ঘুরে, প্রকল্পের বাসিন্দা-শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য কি ছিল সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও, নাকি এর আড়ালে ছিল নিউ গিনি প্রোপার্টিজকে ঘিরে বড় কোনো বিরোধ?

পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যেও জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে প্রকল্পটির মালিকপক্ষের দাবি, বিষয়টি শুধু জমি নিয়ে বিরোধ নয়; এর সঙ্গে চাঁদা দাবি এবং দখলের চেষ্টা জড়িত। অন্যদিকে স্টুডিও কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছে কোনো চাঁদা দাবি বা ব্যক্তিগত শত্রুতার তথ্য নেই। ফলে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো তদন্তের বিষয়।

রাতের কয়েক ঘণ্টায় বদলে গেল পুরো প্রকল্প
রোববার সরেজমিনে নিউ গিনি প্রোপার্টিজে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়ক থেকে প্রায় ২০০ গজ ভেতরে প্রকল্পটির অবস্থান। প্রধান ফটকেই হামলার চিহ্ন স্পষ্ট। লোহার গেটের বিভিন্ন অংশ বাঁকা হয়ে গেছে, কোথাও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের দাগ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতের বেলায় হামলাকারীরা অস্ত্র নিয়ে গেটে আঘাত করে ভেতরে ঢোকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় হামলাকারীর সংখ্যা নিয়ে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও কয়েকজনই জানিয়েছেন, একাধিক পিকআপে করে লোকজন এসেছিল।

প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মী মো. পল্লবের দাবি, হামলাকারীরা চার থেকে পাঁচটি পিকআপে করে এসেছিল। প্রকল্পে ঢোকার পর তারা সামনে পাওয়া জিনিসপত্র লুট করে এবং যা নিতে পারেনি, সেগুলো ভাঙচুর করে। এই বর্ণনা থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট, হামলাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট কক্ষ বা স্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল না।

গেট থেকে ভবন, এরপর স্টুডিও
প্রধান ফটক পার হওয়ার পরই একটি ১০তলা ভবন। সেখানেও ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ভবনটির একটি ফ্ল্যাটে থাকা এক চিকিৎসক দম্পতিকেও হামলাকারীরা মারধর করেছে এবং মালামাল নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এলাকা ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। বর্তমানে তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।

এরপর আরও ভেতরে টিনশেড স্থাপনার মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও।

স্টুডিওর বাইরের একাধিক প্রবেশপথে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভাঙা কাচ, ছড়িয়ে থাকা আসবাব ও যন্ত্রপাতি। কোথাও কাঠের অংশ ভেঙে পড়ে আছে, কোথাও কনটেন্ট তৈরির সরঞ্জামের খণ্ডাংশ। সিসিটিভির তারও কেটে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাস্থলে গুলির খোসাও পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্টুডিওর এমন কোনো অংশ প্রায় অক্ষত নেই, যেখানে হামলার চিহ্ন নেই।

হামলার সময় ওয়াশরুমে আশ্রয় দুই কর্মীর
হামলার সময় স্টুডিওতে ছিলেন দুই কর্মী। স্টুডিওটির প্রতিনিধি ইলার ভাষ্য, শুরুতে তারা বিষয়টি বুঝতে পারেননি। পাশের নির্মাণকাজের শব্দ মনে করে তারা সেটিকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই নিয়েছিলেন।

পরে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তারা ওয়াশরুমে গিয়ে আত্মগোপন করেন এবং ফোন করে বিষয়টি জানান। পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ইলার দাবি, ততক্ষণে হামলাকারীরা তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নিয়েছিল।

তবে স্টুডিও কর্তৃপক্ষের কাছে হামলার কোনো নির্দিষ্ট কারণের তথ্য নেই বলে জানান ইলা।

তার ভাষ্য, কোনো চাঁদা দাবি বা ব্যক্তিগত শত্রুতার বিষয় তাদের জানা নেই। বড় প্রকল্পের ভেতরে স্টুডিওটি অবস্থিত হওয়ায় মূল প্রকল্পকে ঘিরে কোনো বিরোধের অংশ হিসেবেই তারা হামলার শিকার হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন তিনি।

শুধু ভাঙচুর নয়, সরানো হয়েছে দামি সরঞ্জামও
স্টুডিও কর্তৃপক্ষের হিসাবে, হামলার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামও পাওয়া যাচ্ছে না। ইলার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি ক্যামেরা, তিনটি লেন্স, চারটি লাইট, চারটি সফটবক্স এবং সিসিটিভির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন জিনিস নিয়ে গেছে হামলাকারীরা।

ফলে ক্ষতির ধরন দুটি, একদিকে পরিকল্পিতভাবে সরঞ্জাম নষ্ট করা, অন্যদিকে মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাওয়া।

স্টুডিও কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য।

শ্রমিকদের ঘরেও ঢুকেছিল হামলাকারীরা
ঘটনাটিকে শুধু স্টুডিওকেন্দ্রিক হামলা হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রকল্পে থাকা নির্মাণ শ্রমিকদের থাকার জায়গাতেও হামলাকারীরা ঢুকেছিল বলে অভিযোগ।

শ্রমিক নয়নের ভাষ্য, ওই রাতে প্রায় ৫০ জন শ্রমিক সেখানে ছিলেন। হামলাকারীদের দেখে তারা বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে পড়েন। তার দাবি, হামলাকারীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি রামদা, চাপাতি ও লাঠি ছিল এবং গুলির শব্দও শোনা যায়।

নয়ন অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের কক্ষ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর হিসাবে অন্তত ১৬টি মোবাইল এবং শ্রমিকদের জমানো টাকা খোয়া গেছে।

তবে এসব অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।

‘আমি থাকলে লাশ হয়ে যেতাম’
হামলার সময় প্রকল্পের ম্যানেজার জামাল উদ্দিন সেখানে ছিলেন না। এ ঘটনাকে নিজের জন্যও বড় বিপদ হিসেবে দেখছেন তিনি।

জামাল উদ্দিন জানান, প্রকল্পে মোট ১২টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি নিউ গিনি প্রকল্পের এবং বাকিগুলো অন্যদের।

ঘটনার রাতে তিনি এশার নামাজের পর বাসায় চলে যান। তাঁর ভাষ্য, ওই সময় অফিসে থাকলে হামলাকারীদের হাতে তিনিও আক্রান্ত হতে পারতেন।

জামাল উদ্দিন আরও জানান, নতুন বাসায় ওঠার প্রস্তুতি হিসেবে কেনা কিছু মালামাল অফিসে রাখা ছিল। সেগুলোও নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছিল?
নিউ গিনি প্রোপার্টিজে মোট পাঁচটি গেট। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, রাতে প্রতিটি গেটে একজন করে নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্বে ছিলেন।

কিন্তু হামলার সময় সেই নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ।

নিরাপত্তাকর্মী আবদুর রাজ্জাক জানান, হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের কয়েকজনকে মারধর করেছে। তাদের কয়েকজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এখানে তদন্তের আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে, পাঁচটি গেটে নিরাপত্তাকর্মী থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বড় একটি দল অস্ত্রসহ প্রকল্পের ভেতরে ঢুকে দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর সুযোগ পেল?

এর উত্তর এখনো মেলেনি।

মাস্ক পরা লোকজন, একাধিক পিকআপ
স্থানীয় এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাত সাড়ে ১০টার পর তিনি কয়েকজনকে দলবদ্ধভাবে প্রকল্পের দিকে যেতে দেখেছিলেন। তাদের মুখে মাস্ক ছিল বলে দাবি তাঁর।

অন্যদিকে প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মী পল্লবের দাবি, হামলাকারীরা চার থেকে পাঁচটি পিকআপে করে এসেছিল।

আলাদা আলাদা সাক্ষ্যের এই অংশগুলো মিলিয়ে হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠছে। তবে কেবল প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

মালিকপক্ষের অভিযোগ: চাঁদা ও জমি দখল
নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া ঘটনাটিকে আকস্মিক হামলা হিসেবে দেখছেন না।

তার দাবি, চাঁদা আদায় এবং জমি দখলের উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ একটি চক্র এই হামলা চালিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে বিভিন্ন সময়ে তার কাছে এক কোটি, ৫০ লাখ ও দুই কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়েছে। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর হামলা হয়েছে বলে দাবি তার।

মালিকপক্ষ আরও দাবি করছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কেউ কেউ এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে মালিকপক্ষের বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে; তদন্তে এর সত্যতা যাচাই হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে।

জমি নিয়ে আলাদা বিরোধের কথাও বলছেন মালিক
নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার বক্তব্যে আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে, একটি জমি নিয়ে বিরোধ। তিনি দাবি করেন, সাবেক এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে তিনি ১০ কাঠা জমি কিনেছেন এবং সেটি রেজিস্ট্রিও হয়েছে। তবে পাশের আরও একটি জমি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

মালিকপক্ষের দাবি, ওই জমিটি উন্নয়নের জন্য তাঁর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও পরে সেটি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়নি। বরং প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

এই দাবির সঙ্গে শনিবারের হামলার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও এখন তদন্তের বিষয়।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জমি-বিরোধের ইঙ্গিত
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে জমি বা জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের সম্ভাবনা তারা দেখছেন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

এর আগে, ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার নাজমুল হকও জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের কথা জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ জমিতে যেতে পারছিল না এবং সেই বিরোধের মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অর্থাৎ, পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য এবং স্টুডিও কর্তৃপক্ষের ধারণার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে, স্টুডিওটি হয়তো মূল বিরোধের কেন্দ্র নয়।

তাহলে আসল লক্ষ্য কী?
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। হামলাকারীরা কেন একাধিক পিকআপে করে রাতে প্রকল্পে ঢুকল?

অস্ত্রসহ এত মানুষ ঢোকার পরও তারা কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালানোর সুযোগ পেল?

কেন শুধু স্টুডিও নয়, আবাসিক ভবন, শ্রমিকদের থাকার জায়গা ও নিরাপত্তাকর্মীরাও হামলার শিকার হলেন?

স্টুডিওর সরঞ্জাম ভাঙচুরের পাশাপাশি মূল্যবান যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল?

মালিকপক্ষের দাবি করা চাঁদা ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে হামলার সম্পর্ক কতটা?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও কি হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল, নাকি বড় কোনো বিরোধের মধ্যে থাকা একটি স্থাপনা হিসেবে এটি আক্রান্ত হয়েছে?

এসব প্রশ্নের কোনো একটিরও চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় অস্ত্রসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তদন্ত এগোলে হামলার পরিকল্পনা, অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও তথ্য বেরিয়ে আসার কথা।

এই মুহূর্তে ঘটনাস্থলের ধ্বংসস্তূপ তাই শুধু একটি স্টুডিও বা আবাসিক প্রকল্পে হামলার চিহ্ন নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা জমি-বিরোধ, চাঁদার অভিযোগ, দখলচেষ্টা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই তদন্তের মূল চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *