ছয় বছরের বেশি সময় সৌদি আরবে কাটিয়ে দেশে ফিরেছিলেন ওমার ফারুক। সঙ্গে ছিল দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সঞ্চয়, ৪ হাজার ৭০০ সৌদি রিয়াল ও প্রায় ৮৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার। স্বজনদের নিয়ে নিরাপদে গ্রামের বাড়িতে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বাড়ির পথে মাত্র দেড় মিনিটের এক ঘটনায় বদলে যায় সবকিছু।
পুলিশ পরিচয়ে একটি দল গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির কথা বলে ওমার ফারুকের কাছে থাকা রিয়াল ও স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। শনিবার (৩ অক্টোবর) ভোর ৫টা ৬ মিনিটের দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের গণভবনসংলগ্ন জুলাই জাদুঘর ও জিয়া উদ্যানের সিগন্যাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী ওমার ফারুক। তার অভিযোগ, নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে চার-পাঁচজন ব্যক্তি তাদের গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালান। পরে তার সঞ্চয় করা টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
ছয় বছরের প্রবাসজীবনের সঞ্চয়
কেরানীগঞ্জের সুবর্ণসুর গ্রামের দুদু মিয়ার চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ওমার ফারুক। ২০২০ সালের মার্চে ফ্রি ভিসায় সৌদি আরবে যান তিনি। সেখানে একটি কোম্পানির টিস্যু ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন।
প্রবাসে থাকার সময় পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যতের কথাও ভেবেছিলেন ওমার। দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চয় করে কিছু অর্থ জমিয়েছিলেন, কিনেছিলেন স্বর্ণালংকারও। ছয় বছরের বেশি সময় পর ছুটিতে দেশে ফেরার সময় সেগুলোই সঙ্গে নিয়ে আসেন।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। খবর পেয়ে তাকে নিতে আগেই বিমানবন্দরে পৌঁছে যান বাবা দুদু মিয়া। সঙ্গে ছিলেন চাচাতো ভাই আব্দুর রহমান ও দুলাল মিয়া।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে রাত সাড়ে ১২টা বেজে যায়। গভীর রাতে সড়কে ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় তখনই গ্রামের উদ্দেশে রওনা না হয়ে বিমানবন্দরেই অপেক্ষা করেন তারা। ছেলেকে নিরাপদে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য বাবাও রাতটি সেখানেই কাটান।
ভোর পৌনে ৫টার দিকে অবশেষে প্রাইভেটকারে করে কেরানীগঞ্জের সুবর্ণসুর গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তারা।
ইউটার্ন নেওয়ার সময় সামনে হায়েস
অভিযোগে ওমার ফারুক জানান, গাড়িটি গণভবনসংলগ্ন জুলাই জাদুঘর ও জিয়া উদ্যানের সিগন্যাল পার হয়ে বামে ইউটার্ন নেওয়ার সময় পেছন থেকে একটি হায়েস গাড়ি এসে তাদের গাড়ির সামনে দাঁড়ায়।
হায়েস থেকে চার-পাঁচজন ব্যক্তি নেমে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। গাড়িতে অবৈধ মালামাল থাকার খবর পেয়েছেন জানিয়ে তারা তল্লাশি করার কথা বলেন।
ওমারের ভাষ্য, ওই ব্যক্তিরা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলছিলেন। তাই শুরুতে তাদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হয়নি। তারা আশ্বস্ত করেছিলেন, তল্লাশির সময় কোনো কিছু নেওয়া হবে না। এরপর গাড়িতে তল্লাশি শুরু করেন তারা।
একপর্যায়ে গাড়ির চাবি নিয়ে নেন অভিযুক্তরা। এরপর ওমারের কাছে থাকা ৪ হাজার ৭০০ সৌদি রিয়াল এবং প্রায় ৮৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার নিয়ে যান। তবে তার মোবাইল ফোনসহ অন্য কোনো জিনিস নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি।
‘সবকিছু দেড় মিনিটেই শেষ’
ওমার ফারুক জানান, পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে। অভিযুক্তরা চলে যাওয়ার সময় তাদের চিৎকার বা কোনো ধরনের প্রতিবাদ না করার জন্য হুমকি দেয়।
ওমারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের একজন যাওয়ার সময় হুমকির সুরে বলেন, ‘সোজা যা, কোনো চিল্লাচিল্লি করবি না।’ এ সময় তিনি একজনের হাতে ছুরি এবং আরেকজনের হাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত লাইট স্টিক দেখতে পান বলেও জানান।
ঘটনার পর ঝুঁকি না নিয়ে তারা সরাসরি গ্রামের বাড়ির দিকে চলে যান।
অভিযোগ নিলেও এখনো মামলা হয়নি
শনিবার দুপুরে তারা আবার ঘটনাস্থলে যান। পরে ঘটনাটি শেরেবাংলা নগর থানার আওতাধীন এলাকায় হয়েছে নিশ্চিত হয়ে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন ওমার।
ভুক্তভোগী মামলা করতে চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে মামলা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার পরিবারের। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর মামলা নেওয়া হবে।
শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হবে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর মামলা গ্রহণ করা হবে।
বাড়ি ফিরেও স্বস্তি নেই
প্রবাসে থাকার সময় পরিবারের জন্য অর্থ পাঠিয়েছেন ওমার। দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরার দিনটিতে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই সেই আনন্দ পরিণত হয় আতঙ্কে।
ওমার বলেন, তার কাছে থাকা অর্থ ও স্বর্ণালংকার শুধু সম্পদ ছিল না; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রবাসজীবনের দীর্ঘ পরিশ্রম, অপূর্ণ ইচ্ছা এবং পরিবারের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
তিনি বলেন, দেশে ফিরেও ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় রাতে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হননি। অথচ শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফেরার পথেই ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন।
ওমারের বাবা দুদু মিয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং তার ছেলের লুট হওয়া রিয়াল ও স্বর্ণালংকার উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
চাচাতো ভাই সুলেমান আকাশ বলেন, পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকে ওমার দীর্ঘদিন প্রবাসে পরিশ্রম করেছেন এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। রাতে বাড়ি ফেরেননি ছিনতাইয়ের ভয়েই। অথচ শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটল।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সকালে বাড়িতে পৌঁছে ঘটনার কথা জানার পর ওমারের মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর ঘটনার আকস্মিকতা ও ছিনতাইকারীদের হুমকির কারণে ওমার এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
এখন তার একটাই প্রত্যাশা, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা এবং দীর্ঘ প্রবাসজীবনে কষ্ট করে জমানো অর্থ ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা।








