মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

যুদ্ধের মধ্যে আট মাসে বিদেশে গেছেন প্রায় সাড়ে চার লাখ কর্মী, একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ২৫.৭৪ বিলিয়ন ডলার

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিদেশে বাংলাদেশের কর্মী যাওয়া থেমে নেই। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বের ১০৯টি দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশে গেছেন প্রায় সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি। তবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা এখনো বড়। একই সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে দেশে এসেছে ২৫ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৫০৮ জন বাংলাদেশি কর্মী। অর্থাৎ এই আট মাসে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকের গন্তব্য ছিল দেশটি। ফলে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে বিএমইটি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে কর্মী যাওয়া এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের এ চিত্র উঠে এসেছে।

কর্মীর বড় গন্তব্য এখনো সৌদি আরব
বিএমইটির তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৫০৮ জন বাংলাদেশি কর্মী। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুরে গেছেন ৫৩ হাজার ২৯৭ জন। এ ছাড়া কাতারে ৪২ হাজার ৫১৬, মালদ্বীপে ২৪ হাজার ৭০, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ হাজার ৬৬১ এবং কুয়েতে ২০ হাজার ২৫৪ জন কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন।

এই ছয়টি দেশের পরিসংখ্যানেই বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মীদের প্রধান গন্তব্যগুলোর চিত্র স্পষ্ট হয়। তবে সৌদি আরবে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দেশটির শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান খাতেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জর্ডানে ১০ হাজার ১০, ইতালিতে ৭ হাজার ৭৭, পর্তুগালে ৫ হাজার ৩৮৬ এবং ইরাকে ২ হাজার ৮৭৮ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। মরিশাস, সার্বিয়া, ফিজি, বেলারুশ ও রাশিয়াসহ আরও বিভিন্ন দেশেও কর্মী পাঠানো হয়েছে।

তবে ১০৯টি দেশে কর্মী যাওয়ার তথ্য থাকলেও শুধু দেশের সংখ্যা দিয়ে শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য বিচার করা যায় না। কোন দেশে কত কর্মী যাচ্ছেন, তাদের কী ধরনের দক্ষতা রয়েছে এবং এসব বাজারে কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা কতটা, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্সে বড় প্রবাহ, মাসভেদে ওঠানামা
বিদেশে কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৫৭৩ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার, যা প্রায় ২৫ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার।

মাসভিত্তিক হিসাবে মার্চে সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ১০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এপ্রিলে এসেছে ৩১২ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। মে মাসে ৩৪৪ কোটি ২৫ লাখ ৮০ হাজার এবং জুনে ২৮১ কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার ডলার এসেছে।

জুলাইয়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার। আগস্টে এসেছে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার এবং সেপ্টেম্বরে ২৭৬ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনে দেশে এসেছে আরও ৯৯ কোটি ডলার।

পরিসংখ্যান বলছে, মাসভেদে রেমিট্যান্সের পরিমাণে ওঠানামা থাকলেও আলোচ্য সময়ে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ উল্লেখযোগ্য ছিল। তবে এই প্রবাহের স্থায়িত্ব নির্ভর করে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ, কর্মীদের আয় এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ধারাবাহিকতার ওপর।

যুদ্ধের মধ্যে নতুন শ্রমবাজার খুঁজছে সরকার
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।

তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খোঁজা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি কর্মী অবৈধ হয়ে পড়েছিলেন, তাদের বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরির চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন দেশ সফর করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করছেন।

সরকারের এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সম্ভাব্য সুযোগগুলো কত দ্রুত বাস্তব নিয়োগে রূপ নেয়, তার ওপর। নতুন কোনো দেশে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ আর কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। চুক্তি, ভিসা, নিয়োগের শর্ত এবং কর্মীদের দক্ষতা যাচাইয়ের ধাপগুলো পেরিয়ে কতজন বাস্তবে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন, সেটিই হবে অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

মালয়েশিয়া, ওমান ও ইতালিকে ঘিরে প্রত্যাশা
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কলিং ভিসায় কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতাও শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত শ্রমবাজার-সংক্রান্ত পাঁচ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। এরপর নতুন চুক্তির মাধ্যমে আরও বেশি কর্মী পাঠানোর প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।

এদিকে ওমান বিভিন্ন খাতে ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতালির রাষ্ট্রদূত অ্যান্তোনিও আলেসান্দ্রো প্রতিবছর প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে পরিবারসহ ইতালিতে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তবে এসব উদ্যোগের ক্ষেত্রে আগ্রহ প্রকাশ, সমঝোতা এবং বাস্তবে কর্মী নিয়োগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কতজন কর্মী কোন সময়সীমায় যেতে পারবেন, তাদের যোগ্যতা কী হবে এবং নিয়োগের শর্ত কী থাকবে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে সম্ভাবনাগুলো আরও স্পষ্ট হবে।

দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে
নতুন শ্রমবাজার তৈরির পাশাপাশি দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। কাতার ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের কারিগরি কর্মী ও প্লাম্বিং খাতে বাংলাদেশি কর্মী নিতে আগ্রহী। এ লক্ষ্যে দেশটিকে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের তালিকা দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত কর্মী বাছাই করে নিয়মিত নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

অন্যদিকে দুবাইয়ের একটি ট্যাক্সি কোম্পানি ৬ হাজার দক্ষ চালক নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এ ধরনের চাহিদা পূরণে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। নিয়োগদাতার চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং নিয়োগের শর্ত সম্পর্কে কর্মীদের স্পষ্ট ধারণা নিশ্চিত করাও জরুরি। এতে বিদেশে গিয়ে কাজ না পাওয়া বা প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার অমিলের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

নিরাপত্তা ও কল্যাণেও গুরুত্ব
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে নতুন করে কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী আরও জানান, প্রবাসীদের হাতে দ্রুত প্রবাসী কার্ড পৌঁছে দেওয়া, তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে। নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণেও সরকার কাজ করছে।

অর্থাৎ যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মীদের যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। নতুন শ্রমবাজারে বাস্তব নিয়োগ নিশ্চিত করা, দক্ষ কর্মী তৈরি, বিদ্যমান বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র: বাসস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *