সৌদি আরবে সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশির কারাবন্দি থাকার তথ্য সামনে আসার পর বিদেশে আটক নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা, কনস্যুলার সহায়তা এবং দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, গুরুতর ফৌজদারি মামলায় আটক নাগরিকদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা কতটা কার্যকর এবং এসব উদ্যোগের ফলাফল সম্পর্কে কতটা তথ্য পাওয়া যায়।
এর মধ্যেই সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবরের হামলায় নিহত বাংলাদেশি শ্রমিক শাহেদ আহমেদের মরদেহ দেশে ফিরেছে। শুক্রবার সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে মরদেহবাহী উড়োজাহাজ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। একদিকে নিহত প্রবাসীর মরদেহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ, অন্যদিকে বিদেশের কারাগারে হাজারো বাংলাদেশির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, দুটি বিষয়ই প্রবাসীদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও সক্ষমতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
মৃত্যুদণ্ডের আগে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল?
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, ওই দুই ব্যক্তির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি ২০২৩ সালের।
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ঠিক কী ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, দূতাবাস কতবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং দণ্ড কার্যকর ঠেকানো বা কমানোর কোনো সুযোগ ছিল কি না, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রয়েছে এবং আটক ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু বিদেশে কোনো বাংলাদেশি গুরুতর মামলায় আটক হলে তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য দণ্ড লাঘবে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা রয়েছে, তা নিয়েও স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু সরকার চিঠি পাঠিয়েছে কি না, তা নয়; বরং নেওয়া উদ্যোগের ধরন, সময় এবং ফলাফল কী ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে সময়মতো আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব অনেক বেশি।
কারাগারে বন্দিদের বিষয়ে কতটা তথ্য রয়েছে?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে প্রায় সাত হাজার ৫০০ বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন বিচারাধীন, কতজনের সাজা হয়েছে, কতজন গুরুতর অপরাধের মামলায় আটক এবং কতজনকে দেশে ফেরানোর সুযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।
এই তথ্যগুলো জানা গেলে বন্দিদের পরিস্থিতি, আইনি সহায়তার প্রয়োজন এবং দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেত। একই সঙ্গে কোন ধরনের মামলায় দূতাবাসের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করাও সহজ হতো।
কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের সাজা হওয়ার খবর মন্ত্রণালয়ের কাছে পৌঁছালে তাকে রক্ষার উপায় খুঁজতে দ্রুত চেষ্টা শুরু করা হয় বলে জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ। তবে বিপুলসংখ্যক বন্দির ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ কীভাবে পরিচালিত হয়, নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের কাঠামো রয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে জানা জরুরি।
শাহেদের মরদেহ ফেরানোয় সমন্বিত উদ্যোগ
সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবরের হামলায় নিহত বাংলাদেশি শ্রমিক শাহেদ আহমেদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শুক্রবার সকালে ঢাকায় মরদেহ পৌঁছানোর পর তিনি তা গ্রহণ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দ্রুত মরদেহটি দেশে আনা সম্ভব হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর এ পর্যন্ত ১০ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনা হয়েছে; শাহেদ এ তালিকার ১১তম ব্যক্তি।
শাহেদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিতে বিনা মূল্যে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ প্রবাসীর মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের একটি উদাহরণ। তবে বন্দিদের আইনি সুরক্ষা ও মৃত্যুদণ্ডের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়মিত ও আগাম ব্যবস্থা রয়েছে, সেটি আলাদা করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
অন্য দেশের উদ্যোগের সঙ্গে তুলনা, তবে বাস্তবতা যাচাই জরুরি
বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের দেশে ফেরাতে শ্রীলঙ্কার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের ভূমিকার তুলনাও আলোচনায় এসেছে। এ তুলনার মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠছে, প্রবাসীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা দ্রুত, সমন্বিত ও ফলপ্রসূ।
তবে দুই দেশের নাগরিকদের আটকের কারণ, সংশ্লিষ্ট আইনি পরিস্থিতি এবং প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া এক কি না, তা যাচাই না করে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। তারপরও বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের জন্য সরকারের সহায়তা কতটা কার্যকর, তা মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা এ আলোচনা সামনে এনেছে।
প্রবাসীদের সুরক্ষায় দূতাবাসের সক্ষমতা কতটা?
সৌদি আরবে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বিপুলসংখ্যক নাগরিকের উপস্থিতির কারণে দেশটিতে কোনো বড় ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ সরকার উদ্বিগ্ন থাকে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এত বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর ক্ষেত্রে কনস্যুলার সেবা, আইনি সহায়তা, বন্দিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাদের পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা কার্যকর রাখা বড় দায়িত্ব। বিশেষ করে গুরুতর অপরাধের মামলায় আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইনজীবীর সহায়তা নিশ্চিত করা, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দণ্ড লাঘবের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে সৌদি আরবে বন্দি বাংলাদেশিদের জন্য বর্তমানে কী পরিমাণ আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, দূতাবাস কতজন বন্দির মামলা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে কিংবা কতজনকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রয়োজন।
অভিবাসন ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ
বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের গন্তব্য দেশের আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে আগেই জানার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মী নিয়োগের খরচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, দালালদের কারণে অভিবাসী কর্মীদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রী তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বিদেশে যাওয়ার আগে আইন সম্পর্কে সচেতনতা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং কর্মীদের সঠিক তথ্য দেওয়া, এসব উদ্যোগ প্রবাসীদের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে বিদেশে পৌঁছানোর পর কোনো কর্মী আইনি জটিলতায় পড়লে তাকে সহায়তা করার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি জবাবদিহিও জরুরি
সৌদি আরবে সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশির কারাবন্দি থাকার তথ্য এবং দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। শাহেদ আহমেদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ যেমন সামনে এসেছে, তেমনি বন্দিদের নিয়মিত আইনি সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গুরুতর মামলায় কূটনৈতিক তৎপরতার ফলাফল নিয়েও স্পষ্ট তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
বিদেশে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু বিপদের পর প্রতিক্রিয়া জানানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আগাম সচেতনতা, কার্যকর কনস্যুলার সহায়তা, সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং নেওয়া পদক্ষেপের ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছতা।
সৌদি আরবের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং তাদের আইনি পরিস্থিতি অনুযায়ী সহায়তার অগ্রগতি তুলে ধরা হলে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের জবাব দেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের সুরক্ষায় সরকারের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পথও তৈরি হবে।








