বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্ত চায় এইচআরএসএস

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বিদেশে আটক নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা এবং সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটি বলেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশন বিষয়টি জানত কি না, তা স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহি এবং বিদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য কার্যকর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।

বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানায় সংগঠনটি।

বিবৃতিতে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশন এ বিষয়ে অবগত ছিল না বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি সত্য হলে বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা ও কনস্যুলার সহায়তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয় বলে মনে করে এইচআরএসএস।

বিচারপ্রক্রিয়া ও আইনি সহায়তার তথ্য প্রকাশের দাবি
দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, আদালতে তাদের বিচার কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

এইচআরএসএসের মতে, বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তার আইনি অধিকার রক্ষা, প্রয়োজনীয় কনস্যুলার যোগাযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সংগঠনটি বলেছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দুই বাংলাদেশির মামলার নথি, বিচারিক কার্যক্রম, দণ্ডাদেশ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংগ্রহ করে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

তিন পক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখার আহ্বান

ঘটনাটি সামনে আসার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ভূমিকা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস।

সংগঠনটির প্রশ্ন, দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে চলা বিচারপ্রক্রিয়া ও তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন অবগত হয়েছিল এবং তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতি কিংবা আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে বলেছে সংগঠনটি। তদন্তে কোনো ব্যর্থতা বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।

বিদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের তথ্যভান্ডার তৈরির দাবি
সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে আটক বাংলাদেশিদের একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে এইচআরএসএস। সংগঠনটির মতে, বিদেশে আটক নাগরিকদের পরিচয়, মামলার ধরন, বিচারিক অবস্থা এবং আইনি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বাংলাদেশিদের জন্য যোগ্য আইনজীবী নিয়োগ, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং আইন অনুযায়ী আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

একই সঙ্গে নিহত দুই বাংলাদেশির পরিবারকে ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সংগ্রহের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।

কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের তাগিদ
ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদেশে বাংলাদেশিদের গ্রেপ্তার, বিচার ও দণ্ডাদেশের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএসএস।

এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে সংগঠনটি। বিদেশে আটক কোনো নাগরিক মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকলে তার মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ যেন সময়মতো নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যবস্থাও গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে।

এইচআরএসএসের বক্তব্য, প্রবাসী নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় সরকারের দায়িত্ব শুধু আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল কি না, তা নির্ধারণের পাশাপাশি বিদেশে আটক সব বাংলাদেশির ন্যায়বিচার ও কার্যকর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কী তথ্য ছিল, তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং এ ঘটনায় কোনো দায়িত্বে অবহেলা ঘটেছে কি না, এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের ফল প্রকাশের আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *