সীমান্তে অনুপ্রবেশ, ইমিগ্রেশন বিভাগের সক্ষমতা ও আটককেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান চালানোর প্রস্তাব উঠেছে মালয়েশিয়ার সংসদে। তবে এ সংকট মোকাবিলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের ধারণা সামনে আসতেই আলোচনায় এসেছে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা, মানবপাচার চক্রের ভূমিকা এবং শরণার্থী ও অবৈধ অভিবাসীদের পৃথকভাবে বিবেচনার বিষয়টি।
মালয়েশিয়ায় অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে এবার শুধু ইমিগ্রেশন বিভাগের ওপর নির্ভর না করে সরকারের পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধী সংসদ সদস্য দাতুক ড. রাদজি জিদিন। তার পরিকল্পনায় রয়েছে দেশজুড়ে সমন্বিত অভিযান, আটক ব্যক্তিদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং প্রয়োজনে সেনাসদস্যদের সম্পৃক্ত করা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) কুয়ালালামপুরে ২০২৭ সালের জাতীয় বাজেট নিয়ে সংসদে আলোচনার সময় তিনি এসব প্রস্তাব দেন। পেরিকাতান ন্যাশনাল জোটের পুত্রাজায়া আসনের এই সংসদ সদস্যের বক্তব্যে উঠে আসে মালয়েশিয়ার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিদ্যমান উদ্বেগ।
সীমান্তের নিরাপত্তায় ঘাটতি কোথায়?
রাদজি জিদিনের বক্তব্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় ঠিক কতজন অনিয়মিত অভিবাসী বসবাস করছেন, তার নির্ভুল হিসাব নেই। একই সঙ্গে সীমান্তের বিভিন্ন অননুমোদিত পথ দিয়ে বিদেশিদের প্রবেশ এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রবেশের অভিযোগও তোলেন তিনি।
তার দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; সীমান্ত সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি কর্মী নিয়োগের শর্ত কঠোর করার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
এখানেই উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সীমান্তে নজরদারি ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে, অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন সেই ঘাটতি কতটা পূরণ করতে পারবে?
কেন অভিযানে সেনাবাহিনী যুক্ত করার প্রস্তাব?
রাদজি জিদিনের যুক্তি, ইমিগ্রেশন বিভাগের জনবল দিয়ে দেশব্যাপী বড় পরিসরের অভিযান পরিচালনা কঠিন হলে সরকারের অন্যান্য সংস্থাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ব্যবহৃত সমন্বিত সরকারি কার্যক্রমের আদলে সেনাসদস্যদেরও অভিযানে যুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি।
এ পরিকল্পনার আরেকটি অংশ হলো, ইমিগ্রেশন বিভাগের আটককেন্দ্রগুলোতে থাকা অনিয়মিত অভিবাসীদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। এ জন্য আটককেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা এবং বর্তমানে কতজন সেখানে রয়েছেন, সে তথ্যও সরকারের কাছে জানতে চেয়েছেন তিনি।
তবে সেনাবাহিনীকে এ ধরনের অভিযানে যুক্ত করার প্রস্তাবটি এখনো একজন বিরোধী সংসদ সদস্যের দাবি। সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন কোনো তথ্য তার বক্তব্য থেকে পাওয়া যায় না।
শুধু অভিবাসীদের আটক করলেই কি সমাধান হবে?
রাদজির প্রস্তাব নিয়ে মালয়েশিয়ায় সমালোচনাও উঠেছে। দেশটির সাবেক ক্লাং আসনের সংসদ সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো বলেছেন, অভিবাসনসংকটের দায় শুধু বিদেশি কর্মীদের ওপর চাপালে এর পেছনে থাকা নিয়োগব্যবস্থা, দুর্নীতি ও শোষণের বিষয়গুলো আড়ালে থেকে যায়।
২০ অক্টোবর ফ্রি মালয়েশিয়া টুডেকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি নিয়োগকারী চক্র, শ্রমিকদের ঋণের বোঝা এবং মানবপাচারে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, সমস্যার মূল কারণগুলো মোকাবিলা না করে শুধু ব্যাপক ধরপাকড় ও বহিষ্কারের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।
এই বিতর্কে আরেকটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানরত অভিবাসী, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তি এবং নিজ দেশে নির্যাতন বা নিপীড়নের ভয়ে পালিয়ে আসা শরণার্থী, সবাই একই পরিস্থিতিতে নেই। তাদের পরিচয়, আইনি অবস্থা ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি যাচাই না করে একই ধরনের ব্যবস্থা নিলে মানবিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সামনে কী প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন?
মালয়েশিয়ার সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু অভিযান পরিচালনা নয়; বরং সীমান্তে অনিয়মিত প্রবেশের পথ বন্ধ করা, দুর্নীতি ও মানবপাচারের অভিযোগ তদন্ত করা, বিদেশি কর্মী নিয়োগব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আটক ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া কার্যকর করা।
রাদজি জিদিনের প্রস্তাব এসব বিষয়ে সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হবে কি না, সেনাবাহিনীকে যুক্ত করার আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো কী হবে, কিংবা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করতে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
অতএব, মালয়েশিয়ার অভিবাসনসংকটের সমাধান কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে শুধু ধরপাকড়ের পরিসরের ওপর নয়; বরং অনিয়মিত প্রবেশের উৎস, নিয়োগব্যবস্থার জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ওপরও।








