মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

ইতালিজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ-সংঘর্ষে অস্থিরতা, উদ্বেগে প্রবাসী বাংলাদেশিরা

জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনসংকট ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ঘিরে ইতালিতে তরুণদের ক্ষোভ ক্রমেই রাজপথে ছড়িয়ে পড়ছে। রোম থেকে মিলান, তুরিন থেকে বোলোনিয়া, বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও নিরাপত্তা জোরদারের ঘটনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর প্রভাব নিয়ে চিন্তিত দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসা, দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশিদের মধ্যে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

ইতালিতে গত ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার পর শনিবার (২৪ অক্টোবর) নতুন করে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশটির একাধিক শহর। রাজধানী রোম, মিলান, তুরিন, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সসহ বিভিন্ন স্থানে হাজারো তরুণ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামেন। কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কোথাও কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের ঘটনা ঘটে। তবে আগের সপ্তাহের মতো ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা এবার দেখা যায়নি।

ইতালির জননিরাপত্তা বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ, সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় সারা দেশে ৪ হাজার ২৯২ জনের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৭১ জনকে পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া হয় এবং ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া ৮৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ৬৯ জন বিদেশি নাগরিক।

তবে এই বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে কতজন কোন দেশের নাগরিক, তা প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তাদের মধ্যে বাংলাদেশি কেউ রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কেন রাজপথে তরুণেরা
ইতালির সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি ও বাড়িভাড়ার খরচ বাড়লেও সেই তুলনায় আয় না বাড়ার অভিযোগ করছেন আন্দোলনকারীরা। বিশেষ করে রোম, মিলান ও বোলোনিয়ার মতো বড় শহরে বাসাভাড়া তরুণ শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার মান, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। জেনারেশন জেড বা জেন-জির অনেকের ধারণা, আগের প্রজন্মের তুলনায় তাদের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুযোগ অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মুভিমেন্তো ১৭ অত্তোব্রে’ বা ‘১৭ অক্টোবর আন্দোলন’ নামে একটি কর্মসূচির প্রচার শুরু হয়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও বিভিন্ন অনলাইন চ্যাট গ্রুপের মাধ্যমে তরুণদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

তবে ইতালির সব বিক্ষোভ একই সংগঠনের নেতৃত্বে হচ্ছে না। শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন ও যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলোও পৃথক কর্মসূচি পালন করছে। আন্দোলনকারীদের একাংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট সমাধানের চেয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতি সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে ক্ষোভ
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মানসম্মত শিক্ষা, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের সংগঠন ‘উনিয়নে দেইলি উনিভেসিতারি’র জাতীয় সমন্বয়ক সাবরিনা ব্রিৎসোলা সম্প্রতি এক সমাবেশে এসব দাবির কথা তুলে ধরেন।

আন্দোলনকারীদের মতে, শুধু শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করলেই হবে না; শিক্ষাজীবন শেষে কাজের সুযোগ এবং স্বাবলম্বী হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনাও থাকতে হবে।

ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস ফিন্টেলমান সিএনএনকে বলেন, ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, এমন ধারণা থেকেই দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বিক্ষোভে রূপ নিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে কর্মজীবনের শুরুর পর্যায়ের চাকরি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কাও তরুণদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বলে তার মত।

ফ্রান্সের আন্দোলনের সঙ্গে সংযোগ
ইতালির তরুণদের বিক্ষোভে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রভাবও লক্ষ করা গেছে। ৭ অক্টোবর রোমের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের শুরুতে প্রকাশিত বিবৃতিতে ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানানো হয়।

তবে ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা চলতি মাসের শুরুতে বলেন, দুই দেশের পরিস্থিতি এক নয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো শিক্ষা, আবাসন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে দুই দেশের তরুণদের উদ্বেগের মধ্যে মিল দেখতে পাচ্ছে।

ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের কৌশল ভাগাভাগি করছে। শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসন এবং তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি দেশগুলোর আন্দোলনে সাধারণ বিষয় হয়ে উঠছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংঘর্ষের মাঠে
সাম্প্রতিক আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো অনলাইনে দ্রুত কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া। ‘১৭ অক্টোবর আন্দোলনের’ আয়োজকেরা ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভস্থল শেষ মুহূর্তে জানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এতে পুলিশের পক্ষে আগাম নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিক্ষোভের আগের দিন দেশটির ১৮টি শহরে তল্লাশি চালায় পুলিশ। আগের সপ্তাহের সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে প্রায় ১০০ জনকে শনাক্ত করা হয়, যাদের প্রায় অর্ধেক অপ্রাপ্তবয়স্ক।

রাজধানী রোমে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ঐতিহাসিক কলোসিয়ামে প্রবেশ করে। শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কুইরিনালের কাছাকাছি এলাকায় পুলিশের দিকে বোতল নিক্ষেপের পর সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ।

তুরিনে সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রায় চার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। পুলিশের বাধা অতিক্রমের চেষ্টা ও সংঘর্ষের সময় কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়। সেখানে দুজনকে গ্রেপ্তার এবং ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

বোলোনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়। সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। স্থানীয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হিসাবে, সেখানে অন্তত ১৯ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন।

ফ্লোরেন্সে বিলাসবহুল দোকানপাটের এলাকার দিকে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ অগ্রসর হলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। অন্যদিকে মিলানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ হলেও পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। সন্ধ্যায় বিভিন্ন মিছিল একত্র হওয়ার পর অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছায় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

নাপোলি, পাদোভা ও বারিসহ আরও কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভ হয়। তবে এসব শহরে বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।

আন্দোলনের সংগঠককে ঘিরে তদন্ত
বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কার্যক্রমের অভিযোগে ৩০ বছর বয়সী ইউসেফ সিহেরকে আটক করেছে মিলানের পুলিশ। ইতালির সংবাদমাধ্যম ‘ইল জর্নো’র তথ্য অনুযায়ী, মরোক্কান বংশোদ্ভূত ইতালীয় নাগরিক সিহের একজন সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তদন্তকারীদের ধারণা, আন্দোলনের ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামভিত্তিক প্রচারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অপরাধে উসকানি এবং সন্ত্রাসী উদ্দেশ্যে অপরাধে উসকানির অভিযোগসহ একাধিক বিষয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে ইতালির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

তাকে মিলানের সান ভিত্তোরে কারাগারে নেওয়া হয়। ২৬ অক্টোবর আটকের বৈধতা পর্যালোচনার জন্য বিচারকের সামনে হাজির করা হলে তাকে কারাগারে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। তার স্ত্রী, ৩২ বছর বয়সী লেবানিজ বংশোদ্ভূত সাজিয়া হাম্মুদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগে তদন্ত চলছে।

আন্দোলনের প্রকাশিত ইশতেহারে প্রচলিত রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যানের কথা বলা হয়েছে। সংগঠনটি নিজেদের স্থায়ী সভাপতি বা মুখপাত্রবিহীন বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানো এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। তবে এই সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থানকে ইতালির সব বিক্ষোভকারীর অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

জ্বালানির চাপ, পরিবহন খাতেও অসন্তোষ
ইতালিতে অর্থনৈতিক অসন্তোষ শুধু শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহন খাতের শ্রমিকেরাও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহসংকট নিয়ে প্রতিবাদ করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ট্রাকচালকদের কাজের খরচ বেড়েছে এবং পরিবহনশ্রমিকদের অবরোধের কারণে কিছু এলাকায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ তরুণদের আবাসন ও কর্মসংস্থানের সংকটের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের আয়-ব্যয়ের চাপও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

কঠোর অবস্থানে মেলোনি সরকার
প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি বিক্ষোভের পর নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ২৪ অক্টোবরের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার এবং নাগরিকদের নিরাপদে বসবাসের অধিকার রক্ষা করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি জানিয়েছেন, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছে।

বিক্ষোভের আগে বিভিন্ন শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়। মিলানের কেন্দ্রস্থলে সেনাসদস্যদেরও নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ পুলিশের কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময়ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্বেগ কোথায়
ইতালির সাম্প্রতিক অস্থিরতায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্বেগের একটি বড় ক্ষেত্র হলো জীবিকা ও ব্যবসা-বাণিজ্য। দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফলমূলের দোকান, মিনিমার্কেট, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বড় শহরগুলোর বাণিজ্যিক এলাকায় এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের জন্য বিক্ষোভের কারণে দোকান বন্ধ রাখা, ক্রেতা কমে যাওয়া কিংবা পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মিলানের কয়েকটি দোকান আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ত্রিয়েস্তেতে সম্ভাব্য বিক্ষোভের আশঙ্কায় কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দোকানের কাচ কাঠ দিয়ে ঢেকে সুরক্ষিত করে। কয়েকটি দোকান সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত ত্রিয়েস্তেতে ঘোষিত বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত না হলেও সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে।

বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে আয় কমে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত বিক্রির ওপর নির্ভরশীল খাদ্যপণ্য ও ফলমূলের দোকানগুলোর ক্ষেত্রে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।

তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বাংলাদেশি মালিকানাধীন কোনো দোকানে সরাসরি হামলা হয়েছে কি না, কোনো বাংলাদেশি আহত হয়েছেন কি না, কিংবা প্রবাসী ব্যবসায়ীদের কতটা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর বিক্ষোভের প্রত্যক্ষ প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

একইভাবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বা আটক হওয়া বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়। ইতালির জননিরাপত্তা বিভাগের হিসাবে, পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া ৩৭১ জনের মধ্যে ৬৯ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন; তবে তাদের জাতীয়তা প্রকাশ করা হয়নি।

সামনে নতুন কর্মসূচি, বাড়ছে অনিশ্চয়তা
২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের পরও আন্দোলন থামার কোনো ইঙ্গিত নেই। তুরিনে সামরিকীকরণবিরোধী আন্দোলনের আয়োজকেরা ৩০ অক্টোবর সাধারণ ধর্মঘট উপলক্ষে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ২০ নভেম্বর ইতালি ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

একদিকে মেলোনি সরকার আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও আবাসনসংকটের সমাধান চাইছেন।

এই পরিস্থিতিতে ইতালির সামনের দিনগুলো কেমন যাবে, তা নির্ভর করছে সরকার কীভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং আন্দোলনকারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবির জবাব দেয় তার ওপর। আর প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে দৈনন্দিন ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মজীবন কতটা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়।

ইতালির অস্থিরতা তাই শুধু রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা তরুণদের বিক্ষোভের বিষয় নয়; এটি দেশটির অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগেরও প্রতিফলন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *