মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

গ্রিসে তিন বাংলাদেশির মৃত্যু: প্রবাসজীবনে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও যোগাযোগের সংকট

দীর্ঘ কর্মজীবন, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে গ্রিসে বসতি গড়েছিলেন তিন বাংলাদেশি। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের মৃত্যু আবারও সামনে এনেছে প্রবাসীদের একাকিত্ব, অসুস্থতায় দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার গুরুত্ব এবং বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা।

জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমানো মানুষের কাছে প্রবাস মানে শুধু আয়-রোজগার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানদের স্বপ্ন এবং দেশে থাকা স্বজনদের ভালো রাখার দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকেই বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন আপনজনদের কাছ থেকে দূরে। কাজ ও ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যে কখনো আড়ালে পড়ে যায় নিজের শরীরের যত্ন, আবার কখনো নিয়মিত যোগাযোগের অভাবে কারও বিপদের খবর পৌঁছাতেও দেরি হয়।

গ্রিসে সম্প্রতি তিন বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনা প্রবাসজীবনের এই দিকগুলো নতুন করে আলোচনায় এনেছে। হবিগঞ্জের সিজান মিয়া দেশে ছুটি কাটিয়ে গ্রিসে ফেরার পাঁচ দিনের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। নোয়াখালীর মোহাম্মদ সেলিম গ্রিসে ফেরার দুই দিনের মাথায় হাসপাতালে মারা যান। আরেক বাংলাদেশি কোরবান আলীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় পেরাইয়াসে তার নিজের মুদি দোকান থেকে, কয়েক দিন দোকান বন্ধ থাকার পর।

মৃত্যুর ঘটনাগুলোর পরিস্থিতি আলাদা হলেও প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি এবং প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহায়তার গুরুত্ব।

দেশে ফেরার আনন্দের পর সিজানের নিথর দেহ
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের বৈঠাখাল গ্রামের সিজান মিয়ার বয়স হয়েছিল ৩৫ বছর। ২০১৯ সালে জীবিকার সন্ধানে গ্রিসে যান তিনি। আট বছরের ছেলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করাই ছিল তার প্রবাসজীবনের অন্যতম লক্ষ্য।

সম্প্রতি দেশে ছুটি কাটিয়ে স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটান সিজান। গত ৩ অক্টোবর আবারও গ্রিসের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়েন তিনি। পরদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে গ্রিসে পৌঁছানোর খবরও জানান। এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি স্বজনেরা।

পরে গ্রিসে থাকা পরিচিতজনদের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, ৮ অক্টোবর রাতে এথেন্সে এক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সিজান। তার মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাংলাদেশ দূতাবাস।

২৫ অক্টোবর মরদেহ ঢাকায় পৌঁছালে তা নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। দুপুরে বৈঠাখাল গ্রামের মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।

পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর প্রত্যাশা নিয়ে বিদেশে যাওয়া সিজানের মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে তার আট বছরের সন্তানের জীবনে। স্বজনদের সঙ্গে ছুটি কাটিয়ে নতুন করে কর্মজীবনে ফেরার যে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি, তা আর পূর্ণ হলো না।

দুই যুগের প্রবাসজীবনের পর সেলিমের অকালপ্রয়াণ
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার পুলপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ সেলিম দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে গ্রিসে বসবাস করছিলেন। ৫৮ বছর বয়সী এই প্রবাসী এথেন্সের একাডেমিয়া এলাকায় নিজের ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

কয়েক মাস বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর গ্রিসে ফেরেন তিনি। কিন্তু দেশে ফিরে আসার পর স্বাভাবিক কর্মজীবনে আর ফেরা হয়নি তার। গ্রিসে পৌঁছানোর পরপরই অসুস্থ বোধ করলে নিজেই এথেন্সের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন।

পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, সেলিম নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করা সেলিমের মৃত্যু প্রবাসীদের স্বাস্থ্যসচেতনতার বিষয়টিও সামনে এনেছে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া কতটা জরুরি, তার ওপর জোর দিয়েছেন কমিউনিটির নেতারা।

গ্রিসের কমিউনিটি নেতা তাজুল ইসলাম বলেন, প্রবাসে অনেক বাংলাদেশি একা বসবাস করেন। কাজ ও ব্যবসার ব্যস্ততায় অনেকে নিজেদের শারীরিক অসুস্থতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেন না। আবার নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে কেউ বিপদে পড়েছেন কি না, তা বোঝাও কঠিন হয়ে পড়ে।

তার মতে, প্রবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং অসুস্থ হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

দোকান বন্ধ থাকায় সামনে এলো কোরবান আলীর মৃত্যুর খবর
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কোরবান আলী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্রিসে বসবাস করছিলেন। দেশটির বন্দরনগরী পেরাইয়াসে একটি মুদি দোকান পরিচালনা করতেন তিনি। দোকানের ভেতরেই একটি কক্ষে রাত কাটাতেন।

গত ৯ অক্টোবরের পর থেকে তার দোকান বন্ধ ছিল। কয়েক দিন ধরে দোকানটি বন্ধ থাকায় একপর্যায়ে ভেতর থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয়দের খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে কোরবান আলীর মরদেহ উদ্ধার করে। ২০ অক্টোবর মরদেহ উদ্ধারের সময় সেটি অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল।

কোরবান আলীর দেশে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। প্রবাসে নিজের ব্যবসা পরিচালনা করলেও তার মৃত্যুর খবর সামনে আসে দোকান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর। বর্তমানে তার মরদেহ এথেন্সের একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।

নোয়াখালী সমিতি ইন গ্রিসের সভাপতি হাফেজ আহমেদ বলেন, প্রবাসে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকায় বিপদে-আপদে পরিচিতজন ও কমিউনিটির মানুষ অনেক সময় প্রথম ভরসা হয়ে ওঠেন। কারও দীর্ঘদিন খোঁজ না পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা একা বসবাস করেন, তাদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা জরুরি।

কোরবান আলীর ঘটনায় দীর্ঘ সময় কারও সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে কীভাবে একটি গুরুতর পরিস্থিতি অজানা থেকে যেতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

প্রবাসীদের পাশে প্রবাসীরাই
গ্রিসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ কাজ, ব্যবসা ও পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব সামলাতে ব্যস্ত থাকেন। কেউ রেস্তোরাঁয় কাজ করেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন, আবার কেউ ছোট ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাদের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে দেশে থাকা পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানদের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনা।

এই দায়িত্ব পালনের পথে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, আপনজনদের কাছ থেকে দূরে থাকা এবং ব্যক্তিগত সমস্যার কথা ভাগ করে নেওয়ার মানুষের অভাব অনেকের জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে একা বসবাসকারী ব্যক্তিরা অসুস্থ হয়ে পড়লে বা অন্য কোনো বিপদে পড়লে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে সিজান, সেলিম ও কোরবান আলীর মৃত্যুকে একই ধরনের ঘটনার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সিজানের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনায়, সেলিম মারা গেছেন অসুস্থতার পর হাসপাতালে এবং কোরবান আলীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে। তিনটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও এগুলো প্রবাসীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্ব নিয়ে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।

কমিউনিটি নেতা তাজুল ইসলামের পরামর্শ, প্রবাসীদের উচিত পরিচিতজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং দীর্ঘ সময় কারও কোনো খোঁজ না পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা।

প্রবাসজীবনে আর্থিক সাফল্য ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুস্থতা এবং সামাজিক সম্পর্কের যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত খোঁজখবর, অসুস্থতায় দ্রুত সহায়তা এবং বিপদের সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস হয়তো সব দুর্ঘটনা বা মৃত্যু ঠেকাতে পারবে না, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিপদ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে হাজার মাইল দূরে থাকা মানুষগুলোর জন্য তাই প্রবাসী কমিউনিটির পারস্পরিক দায়িত্ববোধ শুধু মানবিকতার বিষয় নয়, বরং নিরাপদে বেঁচে থাকার বাস্তব প্রয়োজনও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *