বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংগঠন এনআরবি ওয়ার্ল্ড। এ উদ্যোগে প্রবাসীদের আরও সক্রিয় করতে বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে পারলে দেড় শতাংশ সরকারি প্রণোদনার সুবিধা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে সংগঠনটি।
এ জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দেশের ব্যবসায়ী সমাজের যোগাযোগ তৈরি করতে চায় তারা। এর মাধ্যমে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা সংগঠনটির।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর ঢাকার শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘এনআরবি ওয়ার্ল্ড সামিট ২০২৬’। আয়োজকদের প্রত্যাশা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এক হাজারের বেশি প্রবাসী ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, বিশেষজ্ঞ ও সরকারি প্রতিনিধি এতে অংশ নেবেন।
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব পরিকল্পনার কথা জানান এনআরবি ওয়ার্ল্ডের সভাপতি মোহা. সাহিদুজ্জামান টরিক।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সম্পদ। সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবাসীদের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করে দেওয়া। এরপর সেই বিনিয়োগ কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তা সরকারের দায়িত্ব।
বিদেশি বিনিয়োগ আনলে মিলবে দেড় শতাংশ প্রণোদনা
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করতে সরকারের ঘোষিত দেড় শতাংশ প্রণোদনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এনআরবি ওয়ার্ল্ড। সংগঠনটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা তাদের ব্যবসায়িক অংশীদার, পরিচিত উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশে এনে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রকল্প খুঁজে বের করা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরিতে প্রবাসীরা ভূমিকা রাখবেন।
টরিকের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) বাংলাদেশে আনতে সক্ষম হলে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের ১ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নিয়ে আসা, তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরির খরচ বহন করা সহজ হবে।
তিনি বলেন, কোনো প্রবাসী তার বিদেশি বন্ধুকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করতে পারলে এবং ওই ব্যক্তি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নিয়ে এলে বিনিয়োগের দেড় শতাংশ প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে প্রবাসীরা নিজেরাই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে উদ্যোগী হবেন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশাসনিক সহায়তার আশ্বাস
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে কর অবকাশ, বিনিয়োগের মুনাফা বিদেশে নেওয়ার সুযোগ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন এনআরবি ওয়ার্ল্ডের সভাপতি।
তার দাবি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা এক জায়গায় দেওয়ার জন্য ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর বাণিজ্যিক কাউন্সিলরদেরও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করা সহজ হবে। একই সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য অভিন্ন পরিচয়পত্রের দাবি
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি অভিন্ন পরিচয়পত্র চালুর দাবি জানিয়েছে এনআরবি ওয়ার্ল্ড। সংগঠনটির মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা গেলে তাদের পেশা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ সক্ষমতা সম্পর্কে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য থাকবে।
এ জন্য পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন টরিক।
তিনি বলেন, প্রবাসীরা দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন এবং বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। অথচ তাদের প্রত্যেকের জন্য একটি অভিন্ন পরিচয়পত্র ও নির্দিষ্ট পরিচিতি নম্বর নেই। এমন পরিচয়পত্র চালু হলে প্রবাসীদের তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও কর-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা হবে।
তার মতে, প্রবাসীদের বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশে ব্যবসা করতে গিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। এতে তারা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের শিল্প, ব্যবসা ও অবকাঠামো খাতেও বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।
রেমিট্যান্সের পাশাপাশি জ্ঞান ও প্রযুক্তি আনতে চায় সংগঠনটি
সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যান তুলে ধরে টরিক জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। বছর শেষে এ পরিমাণ ৩৫ থেকে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সিঙ্গাপুর থেকে ২০২৫ সালে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠানো হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দেশটি থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
তবে এনআরবি ওয়ার্ল্ডের পরিকল্পনা শুধু অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বা রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, প্রযুক্তি ও পেশাগত অভিজ্ঞতাও দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে চায় সংগঠনটি।
এ জন্য বিদেশে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তরুণদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও কাজ করতে চায় তারা।
টরিক বলেন, বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং মানুষের সামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগানোই তাদের উদ্দেশ্য। দেশের জন্য কাজ করার সুযোগই তাদের কাছে বড় প্রাপ্তি।
সামিটে বিনিয়োগ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্ব পাবে স্বাস্থ্য খাতও
ডিসেম্বরের দুই দিনের সামিটে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা গবেষণা এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আয়োজন করা হবে ‘গ্লোবাল হেলথ সামিট ২০২৬’।
এতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। সামিটে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা উন্মোচনের পাশাপাশি ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নতুন নির্বাহী কমিটিও ঘোষণা করা হবে।
আয়োজকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্ক, কানাডার টরন্টো, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনি এবং জাপানসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী সংগঠন ও পেশাজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ করছে সংগঠনটি।
সাধারণ প্রবাসী শ্রমিকদেরও সমান গুরুত্ব
এনআরবি ওয়ার্ল্ডের সাংগঠনিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০২০ সালে। তবে সংগঠনটির কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০১৪ সালে সিঙ্গাপুরের একটি হোটেলে ওয়ার্ল্ড বিজনেস সামিট আয়োজনের মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দুবাইয়ে ধারাবাহিকভাবে সামিট আয়োজন করা হয়।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রবাসীদের এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বা উচ্চপর্যায়ের পেশাজীবীদের নয়, সাধারণ শ্রমজীবী প্রবাসীদেরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে টরিক বলেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন চিকিৎসক যেমন সংগঠনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করা একজন সাধারণ প্রবাসী শ্রমিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার প্রত্যাশা, ডিসেম্বরের সামিটের মাধ্যমে দেশ ও প্রবাসের মধ্যে কার্যকর ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগ, অংশীদারত্ব এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।
সংবাদ সম্মেলনে এনআরবি ওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা এনামুল হক এনাম, পরিচালক রেহান রেজা ও আনিসুল কবির জাসিরসহ সংগঠনটির অন্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।








