ইউরোপের দেশ ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড ও ইতালিতে অক্টোবরজুড়ে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তরুণদের আন্দোলন, কোথাও শ্রমিকদের ধর্মঘট, আবার কোথাও বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে দেশগুলোর রাজপথ উত্তপ্ত হয়েছে। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভের বাইরে সংঘবদ্ধ ভাঙচুর, দোকানপাটে লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশগুলোতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বিশেষ করে ফ্রান্সের প্যারিসে বিক্ষোভ-সহিংসতার সময় বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকান লুট হওয়ার ঘটনায় প্রবাসী ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পোল্যান্ডেও বাংলাদেশি মালিকানাধীন একটি রেস্তোরাঁয় জাতিগত বিদ্বেষের অভিযোগে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বেগের কারণ রয়েছে।
অন্যদিকে জার্মানি ও ইতালিতে বড় আকারের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেলেও এসব ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকের সরাসরি আক্রান্ত হওয়ার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশগুলোর পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সব বিক্ষোভের কারণ কিংবা সহিংসতার ধরন এক নয়। কোনো দেশের একটি শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেই পুরো দেশকে দাঙ্গাকবলিত বলা যায় না। তবে প্রবাসীদের ব্যবসা, কর্মসংস্থান, চলাচল ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপর এসব ঘটনার প্রভাব রয়েছে।
ফ্রান্স: বিক্ষোভের আড়ালে লুটপাট, ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা
ফ্রান্সে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়। সদ্য সমাপ্ত অক্টোবরের ১৭ তারিখ দেশটির বিভিন্ন শহরে ব্যাপক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তবে দিনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির একাংশ সন্ধ্যার দিকে সহিংসতায় রূপ নেয়।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা মন্ডের ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেদিন দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে আয়োজক ও সরকারের হিসাবে পার্থক্য ছিল। আয়োজকদের হিসাবে অংশগ্রহণকারী ছিলেন প্রায় আট লাখ। অন্যদিকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসাবে সংখ্যাটি ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার।
প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভের পর দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে মালামাল নিয়ে যায় হামলাকারীরা। লুটপাটের শিকার হয় ইলেকট্রনিক পণ্য, পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রীর দোকান।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহিংসতা শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। লিওঁ, মার্সেই, বোর্দো ও তুলুজসহ বিভিন্ন শহরেও ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিনের সহিংসতায় ১ হাজার ২০০ জনকে আটক করা হয় এবং ১৫০ জন পুলিশ সদস্য ও জেন্ডারমেরি আহত হন। এ সহিংসতার সরাসরি প্রভাব পড়ে প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ওপর।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম টিবিএস নিউজের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিসে হাসান নামের এক বাংলাদেশি প্রবাসীর মোবাইল ফোনের সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক পণ্য ও কুরিয়ার সেবার দোকান লুট করা হয়। প্রায় ১০ বছর ধরে গড়ে তোলা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি হামলাকারীরা তছনছ করে দেয়।
হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ জনের একটি দল দোকানে প্রবেশ করে লুটপাট চালায়। তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণের হুমকি দেওয়া হলে নিরাপত্তার কারণে দোকান ছেড়ে যেতে বাধ্য হন তিনি। পরে দোকানের ভেতরে থাকা পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী লুট হয়ে যায়।
প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই ব্যবসায়ীর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার ইউরো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশি এই ব্যবসায়ীর জন্য ঘটনাটি শুধু দোকান হারানোর নয়, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ হারানোরও।
প্যারিসে বাংলাদেশিদের পরিচালিত অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রিয়া ও মানিগ্রামের মতো আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার সেবার ছোট আউটলেট পরিচালনাকারী ব্যবসায়ীরা নতুন করে সহিংসতা শুরু হলে তাদের প্রতিষ্ঠানও হামলার শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে প্যারিসের ব্যবসায়ী অ্যালান খান চৌধুরীর বক্তব্যও উঠে এসেছে। তার ভাষ্য, চলমান অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
প্যারিসে বসবাসরত সাধারণ বাংলাদেশি কর্মীরাও সমস্যায় পড়েছেন। খাবার সরবরাহের কাজে নিয়োজিত মনির হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের কারণে রাস্তায় চলাচল ও খাবার পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কাজ করতে গিয়ে তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশির বৈধ কাগজপত্র নেই, তাদের পরিস্থিতি আরও জটিল। পুলিশি তল্লাশি ও নজরদারি বাড়লে কাজের প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া নিয়েও তাদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়।
প্যারিস নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানিয়েছে, ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের সহিংসতায় ২১ অক্টোবর পর্যন্ত শহরটিতে ৪৫১টি দোকান ভাঙচুরের শিকার হয়েছিল। এর বাইরে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলেও বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে ফ্রান্সে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মোট সংখ্যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। ফলে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণেরও সুযোগ নেই।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তায় ফ্রান্সের স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিয়েছে। বীমার কাগজপত্র প্রস্তুত, ক্ষতিপূরণের আবেদন এবং প্রশাসনিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের উদ্বেগের পেছনে কেবল সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা নয়, বাস্তবে ঘটে যাওয়া আর্থিক ক্ষতির ঘটনাও রয়েছে।
জার্মানি: ৩৪ শহরে তরুণদের আন্দোলন, ফ্রাঙ্কফুর্টে দোকান লুট
ফ্রান্সের পর অক্টোবরের শেষ দিনে জার্মানিতেও বড় আকারের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে জার্মানির আন্দোলনের প্রধান বিষয় ছিল তরুণদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার বিরোধিতা।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর দেশটির ৩৪টি শহরে Gen Z regelt! নামের একটি সংগঠনের আহ্বানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নামেন।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তারা বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার বিরোধিতা করেন এবং সামাজিক খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানান।
দিনের বেলায় অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার দিকে কয়েকটি শহরে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
রয়টার্সের ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রাঙ্কফুর্টে অন্তত দুটি দোকান লুট করা হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জানালাও ভাঙচুর করা হয়। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের দিকে পাথর, আতশবাজি ও পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও পেপার স্প্রে ব্যবহার করে।
এ ছাড়া বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। হামবুর্গে কয়েকটি ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া হয়।
তবে জার্মানিতে এসব ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের সরাসরি আক্রান্ত হওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ কারণে জার্মানিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি বাংলাদেশিবিরোধী হামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় কর্মস্থলে যাতায়াত, দোকান পরিচালনা এবং গণপরিবহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
জার্মানিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বড় শহরগুলোতে বসবাস করেন। বিক্ষোভের কারণে কোনো এলাকায় সড়ক বন্ধ, দোকানপাট বন্ধ বা গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হলে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে কতজন বাংলাদেশি এসব কারণে কর্মস্থলে যেতে পারেননি কিংবা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
পোল্যান্ড: রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় বর্ণবিদ্বেষী হামলা
পোল্যান্ডের পরিস্থিতি ফ্রান্স ও জার্মানির তুলনায় ভিন্ন। দেশটিতে অক্টোবরের শেষ দিকে রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি বগদান শভিয়েনৎসকোভস্কিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়ারশতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আদালতের কর্তৃত্ব নিয়ে দেশটির সরকার এবং বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের পর সেই বিরোধ রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে কয়েকজন আন্দোলনকারী আদালতের সীমানাপ্রাচীর অতিক্রম করেন এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। পুলিশ তিনজনকে আটক করে।
তবে পোল্যান্ডে বাংলাদেশিদের উদ্বেগের বিষয় শুধু এই রাজনৈতিক বিক্ষোভ নয়। দেশটিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচালিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জাতিগত বিদ্বেষের অভিযোগে হামলার ঘটনাও রয়েছে।
পোল্যান্ডের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম রেডিও ক্রাকোভের ১৩ মে প্রকাশিত এবং ২৩ অক্টোবর হালনাগাদ করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির আন্দ্রিখুভ শহরে বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচালিত একটি কাবাব রেস্তোরাঁয় এপ্রিলের শেষ দিকে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ঘটনার তদন্তে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে প্রসিকিউটররা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি মালিকদের জাতীয় ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাদের ওপর সহিংসতা চালানো এবং রেস্তোরাঁয় আগুন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় আরেক অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্দেহভাজনকেও আটক করা হয়। ১৯ বছর বয়সী অভিযুক্তকে তিন মাসের জন্য হেফাজতে রাখার সিদ্ধান্ত দেন আদালত। অভিযুক্ত ব্যক্তি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পোল্যান্ডের পুলিশের প্রকাশিত তথ্যেও আন্দ্রিখুভের একই রেস্তোরাঁয় একাধিক অগ্নিসংযোগের ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৪ এপ্রিল ও ৯ মে প্রতিষ্ঠানটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
এখানে উল্লেখযোগ্য, ঘটনাটি অক্টোবরের রাজনৈতিক বিক্ষোভের অংশ নয়। এটি পৃথক একটি অপরাধের তদন্ত। তবে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ক্ষেত্রে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ।
পোল্যান্ডে বিদেশিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক আচরণের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগের।
রিফিউজি ইমার্জেন্সি নামের মানবাধিকারকর্মীদের একটি পর্যবেক্ষণ উদ্যোগের ওয়েবসাইটে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশি পরিচয়ের কারণে হয়রানি, আক্রমণ, আটক বা দুর্ব্যবহারের ৩০৪টি ঘটনা নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ঘটনাগুলো ঘটেছে ১০৮টি এলাকায়।
তবে এই সংখ্যা পোল্যান্ড সরকারের সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা যায় না। সংগঠনটি সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সংগ্রহ করে ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করে। তাদের তালিকায় যাচাই করা এবং যাচাইাধীন ঘটনাই রয়েছে।
অতএব, এই পরিসংখ্যানকে বিদেশিদের বিরুদ্ধে অপরাধের সরকারি মোট সংখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। তবে দেশটিতে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের একটি চিত্র এতে পাওয়া যায়।
পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসও এর আগে প্রবাসীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। দূতাবাসের নির্দেশনায় দেশটির আইন মেনে চলা, যাচাই না করা তথ্য প্রচার না করা এবং উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ পরিস্থিতিতে পোল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও কর্মীদের জন্য প্রধান উদ্বেগ হলো তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং জাতিগত পরিচয়ের কারণে সম্ভাব্য হয়রানি।
ইতালি: ৪০টির বেশি শহরে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ, সংঘর্ষ সীমিত কয়েকটি এলাকায়
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ইতালিতেও ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে দেশটির আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল শ্রমিকদের অধিকার, বেতন, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি সেবায় বিনিয়োগ এবং সামরিক ব্যয়।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমিক সংগঠন USB-এর ডাকে ইতালিতে ২৪ ঘণ্টার সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। দেশটির ৪০টির বেশি শহরে শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য পেশার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে ছিল বেতন বৃদ্ধি, সরকারি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির বিরোধিতা।
রোম, মিলান, নেপলস, তুরিন, ভেনিস ও পালেরমোসহ বিভিন্ন শহরে মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে তুরিনে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।
রোমে কয়েকটি ময়লার পাত্রে আগুন দেওয়া হয়। পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা একটি দলকে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে এবং আটজনকে আটক করে। মিলানে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ রিং রোডে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন বস্তুতে আগুন দেয়।
ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসার প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ৩০ অক্টোবরের কর্মসূচির অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ ছিল। রোম, তুরিন ও ভিসেনজায় সীমিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য এসব ঘটনার প্রভাব মূলত কর্মস্থলে যাতায়াত, পরিবহন ও ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে তৈরি হতে পারে। ধর্মঘটের কারণে গণপরিবহন ও বিভিন্ন সেবায় বিঘ্ন ঘটলে শ্রমজীবী প্রবাসীদের দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা হয়।
তবে ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভে বাংলাদেশি নাগরিকের ওপর হামলা, বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকান লুট কিংবা বাংলাদেশিদের হতাহতের কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদ এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
সুতরাং ইতালিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে, এটি নিশ্চিত হলেও বাংলাদেশিরা সেখানে সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন, এমন দাবি করার মতো তথ্য নেই।
চার দেশের পরিস্থিতি কি একই রকম?
চার দেশের সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিক্ষোভের কারণ, সহিংসতার ধরন এবং বাংলাদেশিদের ওপর প্রভাবের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের একাংশ লুটপাটে রূপ নেয়। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
জার্মানিতে তরুণদের আন্দোলন ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার বিরুদ্ধে। আন্দোলনের একাংশে সহিংসতা ও দোকান লুটের ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশিদের সরাসরি আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
পোল্যান্ডে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি বিদেশিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক আচরণের বিষয়টি আলাদা উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্তোরাঁয় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জাতিগত বিদ্বেষের অভিযোগে তদন্ত চলছে।
ইতালিতে শ্রমিকদের সাধারণ ধর্মঘট ও বিভিন্ন সামাজিক দাবিতে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ঘটলেও অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশিদের সরাসরি আক্রান্ত হওয়ার নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি।
বাংলাদেশিদের উদ্বেগ কোথায়?
চার দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগের মূল জায়গা তিনটি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, জীবিকা এবং বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার পরিবেশ।
প্রথমত, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা। ফ্রান্সে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর দোকান লুট হওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে, বিক্ষোভের সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। পোল্যান্ডে রেস্তোরাঁয় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্বেগের।
দ্বিতীয়ত, দৈনন্দিন আয়ের অনিশ্চয়তা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা রেস্টুরেন্ট, ডেলিভারি, দোকান, পরিবহন ও অন্যান্য সেবামূলক কাজে যুক্ত। সড়ক বন্ধ, গণপরিবহন ব্যাহত হওয়া কিংবা দোকান বন্ধ রাখতে হলে তাদের দৈনিক আয় কমে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবেশ। বিদেশিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক আচরণ বাড়লে বাংলাদেশি কর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। সব বিক্ষোভকে অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
দূতাবাসগুলোর কাছে প্রবাসীদের প্রত্যাশা
এ পরিস্থিতিতে চার দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলার কার্যালয়গুলোর নিয়মিত যোগাযোগ এবং তথ্য সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসীরা চাইছেন, সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হোক। কোনো বাংলাদেশি ব্যবসায়ী বা কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বীমা প্রতিষ্ঠান ও আইনি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহযোগিতা করা হোক।
বিশেষ করে ফ্রান্সে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় ক্ষতিপূরণ কর্মসূচিতে আবেদন করতে সহায়তা করা প্রয়োজন।
পোল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জাতিগত বিদ্বেষের অভিযোগে সংঘটিত অপরাধের তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।
জার্মানি ও ইতালিতে আপাতত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলার নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও বড় বিক্ষোভের সময় প্রবাসীদের চলাচল ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড ও ইতালির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে চার দেশেই একই মাত্রার সহিংসতা চলছে কিংবা সব বাংলাদেশি প্রবাসী সরাসরি হামলার ঝুঁকিতে রয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই।
যা নিশ্চিত, ফ্রান্সে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর দোকান লুট হয়েছে, পোল্যান্ডে বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্তোরাঁয় জাতিগত বিদ্বেষের অভিযোগে অগ্নিসংযোগের তদন্ত চলছে। জার্মানি ও ইতালিতে বড় বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেলেও বাংলাদেশিদের সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রবাসীদের উদ্বেগ দূর করতে তাই আতঙ্ক ছড়ানো নয়, প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, নিয়মিত কনস্যুলার যোগাযোগ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ। ইউরোপে বাংলাদেশের লাখো মানুষের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ জড়িয়ে রয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু দূতাবাসের দায়িত্ব নয়, দেশের অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।








