সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। কিন্তু নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তারের মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে, তা এখনো জানতে পারেনি তাদের পরিবার। এমনকি মরদেহ দেশে পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিস্তারিত জানতে ঢাকার পক্ষ থেকে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের কাছ থেকে কোনো জবাব মেলেনি।
রোববার (১ নভেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছিল। তবে সেই নোটের কোনো জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর থেকেই তাদের মরদেহের অবস্থান এবং দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন স্বজনরা।
নজরুলের পরিবারের সদস্যরা জানান, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাদের কাছ থেকে কিছু প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু এরপরও নজরুলের মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে কিংবা সেটি বাংলাদেশে পাঠানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে তাদের কিছু জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, সুইটি আক্তারের বাবা মেয়ের মরদেহ অথবা অন্তত দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ডের খবর যেভাবে জানতে পারে বাংলাদেশ
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পায়নি জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল। পরে সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশিত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতির মাধ্যমে কনস্যুলেট বিষয়টি জানতে পারে।
এরপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণ, সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, আদালতের রায়, আসামিদের আইনি প্রতিনিধিত্ব এবং মরদেহের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক নোট পাঠায় বাংলাদেশ।
কনস্যুলেটের আগের চিঠিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে নজরুল ও সুইটি সৌদি আরবে আটক ছিলেন। তবে ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটের হাতে আসা বাংলাদেশি বন্দিদের তালিকায় তাদের সম্ভাব্য শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না।
এদিকে, নজরুল ও সুইটির পরিবারের সদস্যরাও আগে জানিয়েছিলেন, তাদের স্বজনদের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে—এমন কোনো তথ্য তারা জানতেন না।
কনস্যুলার দায়িত্ব নিয়েও উঠছে প্রশ্ন
বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে তা জানানোর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হলে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ-সংক্রান্ত তথ্য থাকলে বিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হবে।
নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ঘটনার স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডের আগে ওই দুই বাংলাদেশি পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা এবং কনস্যুলার সেবা পেয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
হাইকোর্টে রিট, চাওয়া হয়েছে নথিপত্র
দুই বাংলাদেশির আটক, বিচারপ্রক্রিয়া, সাজা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরো বিষয়টি সামনে আনতে গত ২৮ অক্টোবর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়।
আবেদনে নজরুল ও সুইটির মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশের পাশাপাশি বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ তাদের কী ধরনের কনস্যুলার সহায়তা দিয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘিরে এখনো বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বিশেষ করে বিচারপ্রক্রিয়ায় তাদের আইনি সহায়তার বিষয়টি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ মিশনকে অবহিত করা হয়েছিল কি না এবং মৃত্যুর পর মরদেহের কী ব্যবস্থা করা হয়েছে, এসব বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।








