শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

ভারতের মণিপুর রাজ্য তিন বছর ধরে জ্বলছে

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে একটি বোমা বিস্ফোরণে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এর মাধ্যমে গত কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি আবার অশান্ত হয় ওঠে।

মিয়ানমারের সঙ্গে মণিপুরের ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। রাজ্যটি এখন চরমভাবে বিভক্ত। রাজ্যের উপত্যকায় বসবাসকারী হিন্দুধর্মাবলম্বী মেইতেই জনগোষ্ঠী এবং পাহাড়ে বসবাসকারী প্রধানত খ্রিষ্টান কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে মূলত এই দ্বন্দ্ব চলছে।

সাম্প্রতিক এ সহিংসতা তিন বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধেরই নতুন অধ্যায়। এ সংঘাত রাজ্যটিকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন চরম বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বাস করছে। দীর্ঘ এ লড়াই বন্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

মণিপুরে প্রতিটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ভূখণ্ড নিয়ে বড় বড় দাবি রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের মানচিত্র একটির ওপর আরেকটি গিয়ে পড়ছে। এর ফলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

সম্রাট চৌধুরী, লেখক

গত তিন বছরের মধ্যে রাজ্যটিতে এক বছর কেন্দ্রীয় শাসন জারি ছিল। মণিপুরে বর্তমানে মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দলটি তাদের মুখ্যমন্ত্রীও পরিবর্তন করেছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই সংঘাত মেটাতে পারেনি। রাজ্যটিতে শত শত বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করা দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা ঘুচিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

৭ এপ্রিল সর্বশেষ সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। ১২ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মণিপুরে আসলে কী ঘটেছে

৭ এপ্রিল বিকেলে মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলার ত্রংলাওবি আওয়াং লেইকাই এলাকার একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে মেইতেই সম্প্রদায়ের পাঁচ ও ছয় বছর বয়সী দুই শিশু নিহত হয় এবং তাদের মা আহত হন। শিশুদের বাবা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্য।

মেইতেই নেতারা এ হামলার জন্য কুকি যোদ্ধাদের দায়ী করেছেন। তবে কুকি গোষ্ঠীগুলো এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, গ্রামটি তাদের যাতায়াতের সীমানার মধ্যে পড়ে না।

ভারত স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে মণিপুরে জাতিগত জাতীয়তাবাদের ঢেউ ওঠে। মেইতেই, কুকি ও নাগা—প্রতিটি সম্প্রদায় থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী তৈরি হয়। তারা প্রত্যেকে নিজেদের জন্য আলাদা স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌমত্বের দাবি তুলতে থাকে।

এ ঘটনার পর রাজ্যের ভঙ্গুর শান্তি আবারও ভেস্তে গেছে। বিভিন্ন সংগঠন রাজ্যের প্রায় সব শহর অচল করে দেওয়ার ডাক দিয়েছে। প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন সাধারণ নারী, পুরুষ ও তরুণেরা। তাঁরা সড়ক অবরোধ করেন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। বিক্ষুব্ধ জনতা বেশ কয়েকটি তেলের ট্যাংকারেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন।

হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘাত হয়। এতে বেশ কিছু মানুষ আহত হন। বিষ্ণুপুর থেকে কুকি-অধ্যুষিত চূড়াচাঁদপুর সংযোগকারী প্রধান সড়কটি দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে। ৭ এপ্রিল বিক্ষোভকারীদের ওপর আধা সামরিক বাহিনীর গুলিতে অন্তত আরও তিনজন নিহত হয়েছেন।

১৮ এপ্রিল রাজ্যের উখরুল অঞ্চলে একটি জাতীয় সড়কে অতর্কিত হামলা চালায় একদল সশস্ত্র যোদ্ধা। এতে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসহ দুজন নিহত হন। এ ঘটনা তিন বছরের বেশি সময় ধরে জাতিগত সংঘাতের চক্রে আটকে থাকা রাজ্যটিকে আবারও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কেন জ্বলছে মণিপুর

একসময় মণিপুর ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য। ব্রিটিশ শাসনের পর ১৯৪৭ সালে এটি স্বাধীন ভারতের অংশ হয়। ঐতিহাসিকভাবে মণিপুরের সমতল ও উপত্যকা অঞ্চলে মেইতেইদের আধিপত্য বেশি। রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলও এ এলাকায় অবস্থিত। অন্যদিকে কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে।

স্বাধীন ভারতে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশেষ ভূমি আইন করা হয়েছিল। সে আইন অনুযায়ী মেইতেইরা পাহাড়ি এলাকায় জমি কিনতে পারে না। সেখানে কুকি-জো সম্প্রদায়কে তফসিল উপজাতির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিক্ষা, চাকরি ও রাজনীতিতে তারা বিশেষ কোটা বা সুবিধা পায়।

মণিপুরের মতো থমকে যাওয়া সংঘাতে শত্রুতা সব সময় সামনে আসে না। তবে তা তলেতলে ঠিকই রয়ে যায়। আর এ কারণে মণিপুরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নড়বড়ে।

প্রদীপ ফানজোবাম, সম্পাদক, ইম্ফল ফ্রি প্রেস

পরবর্তী বছরগুলোতে মণিপুরে জাতিগত জাতীয়তাবাদের ঢেউ ওঠে। মেইতেই, কুকি ও নাগা—প্রতিটি সম্প্রদায় থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী তৈরি হয়। তারা প্রত্যেকে নিজেদের জন্য আলাদা স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌমত্বের দাবি তুলতে থাকে।

২০২৩ সালে এ সংঘাত চূড়ান্ত রূপ নেয়। ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদির দল বিজেপির নেতা ও সাবেক ফুটবলার এন বীরেন সিং রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি মেইতেই সম্প্রদায়ের মানুষ।

মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং বিভিন্ন বক্তব্যে পাহাড়ি উপজাতিদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ এবং ‘মাদক সন্ত্রাসী’ বলে সম্বোধন করেন। একই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে মেইতেই জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের অভিযোগ ওঠে।

এরপর ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিল মণিপুর হাইকোর্ট একটি আদেশ দেন। আদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইদের তফসিল উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়। এতে কুকি-জো সম্প্রদায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাদের ভয়, মেইতেইরা এই স্বীকৃতি পেলে তাদের জন্য সংরক্ষিত চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত হবে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের জিরিবামে বোরোবেক্রায় জাতিগত সহিংসতায় নিহত মেইতেইদের ছবি তাঁদের কবরের পাশে রাখা হয়েছে। ২২ নভেম্বর ২০২৪ফাইল ছবি: রয়টার্স

গভীর হচ্ছে বিভাজন

হাইকোর্টের ওই আদেশ রাজ্যজুড়ে জাতিগত দাঙ্গা উসকে দেয়। সংঘাত চলাকালে মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংয়ের বিরুদ্ধে মেইতেইদের পক্ষ নেওয়ার ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদি সে সময় বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশ সফর করলেও মণিপুরে না যাওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।

মণিপুরে ২০২৩ সালে সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়ে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন অন্তত ৬০ হাজার মানুষ। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়ে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন অন্তত ৬০ হাজার মানুষ। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। সরকারি বাহিনী এখন দুই পক্ষের মধ্যকার বাফার জোন বা মধ্যবর্তী এলাকা পাহারা দিচ্ছে। অন্যদিকে দুই সম্প্রদায়ের তরুণ থেকে বৃদ্ধ—সবাই অস্ত্র হাতে নিজেদের এলাকা পাহারা দিচ্ছেন।

বর্তমানে মণিপুরে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২৫০টির বেশি কোম্পানি মোতায়েন রয়েছে। এর ফলে রাজ্যটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সামরিকায়িত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

সহিংসতা বন্ধে ব্যর্থ হওয়ায় মেইতেইদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা হারায় বিজেপি। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মণিপুরের দুটি সংসদীয় আসনেই বিজেপি হেরে যায়, জয়ী হয় কংগ্রেস। রাজনৈতিক চাপের মুখে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বীরেন সিং পদত্যাগ করেন। অবশেষে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী মোদি মণিপুর সফর করেন।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর মণিপুরের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ইয়ুম্নাম খেমচাঁদ সিং জানান, অপরাধীদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তিনি এ বোমা হামলার ঘটনাকে ‘শান্তি বিঘ্নিত করতে আগ্রহী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ’ বলে উল্লেখ করেন।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা এ সংঘাত এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। ত্রংলাওবি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কিন্তু সেখানকার চাষযোগ্য জমির বড় অংশ এখন বাফার জোনের অন্তর্ভুক্ত। ফলে মেইতেই বা কুকি-জো—কোনো পক্ষের কৃষকেরাই এখন আর নিজেদের জমিতে যেতে পারছেন না।

অধরা শান্তি যে কারণে

‘নর্থইস্ট ইন্ডিয়া: আ পলিটিক্যাল হিস্ট্রি’ বইয়ের লেখক সম্রাট চৌধুরী আল-জাজিরাকে বলেন, মণিপুরের আসল সমস্যাটি মূলত জাতীয়তাবাদ এবং মানচিত্রের সীমানা নিয়ে। ভৌগোলিক কারণে এখানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী একই অঞ্চলের ওপর নিজেদের অধিকার দাবি করছে। শত বছরের পুরোনো জীবনযাপন ছেড়ে আধুনিক মানচিত্র আর সীমানার হিসাব-নিকাশে আসার ফলে এই বিরোধ তৈরি হয়েছে।

এই বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রতিটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ভূখণ্ড নিয়ে বড় বড় দাবি রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের মানচিত্র একটির ওপর আরেকটি গিয়ে পড়ছে। এর ফলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

সম্রাট চৌধুরী বলেন, তিন বছর আগে সংঘাতের শুরুতে সরকার পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিলে রাজ্যটি হয়তো আজ এভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হতো না।

ইম্ফল ফ্রি প্রেসের সম্পাদক প্রদীপ ফানজোবাম বলেন, ‘কিছু মানুষ এই অরাজকতা থেকে লাভবান হচ্ছে।’ এ অস্থিরতার সুযোগে কোটি কোটি ডলারের মাদক ব্যবসা চলছে।

মণিপুর মূলত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল বা স্বর্ণালি ত্রিভুজের পাশেই অবস্থিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ অঞ্চল হেরোইন ও আফিমের মতো মাদক পাচারে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।

প্রদীপ ফানজোবামের মতে, সাম্প্রতিক বোমা হামলার পেছনে কার স্বার্থ রয়েছে, তা নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘কিছু স্বার্থান্বেষী মহল চায় এই সংঘাত চলুক। হয়তো বড় কোনো যুদ্ধ নয়। কিন্তু অন্তত এই বিশৃঙ্খলাটুকু বজায় থাকলে তারা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে।’

এই প্রবীণ সাংবাদিক আরও বলেন, দুই পক্ষের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তারা সবাই শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। তারা একে অপরকে শত্রু মনে করে না। তিনি বলেন, ‘মণিপুরের মতো থমকে যাওয়া সংঘাতে শত্রুতা সব সময় সামনে আসে না। তবে তা তলেতলে ঠিকই রয়ে যায়। আর এ কারণে মণিপুরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নড়বড়ে।’

লেখক সম্রাট চৌধুরী বলেন, দিল্লিতে বসে নীতিনির্ধারকেরা হয়তো ভাবছেন, এই সংকট ম্যানেজ করা বা মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। তাঁরা মনে করেন, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম থেকে শুরু করে মানুষ—সবকিছু সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কেন্দ্রীয় নেতাদের এ ধরনের অবহেলাপূর্ণ মনোভাবের কারণেই মণিপুর দিনের পর দিন জ্বলছে এবং আরও বড় অরাজকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বিষয়:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *