মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরানের হামলার জবাবে সৌদি আরব গোপনে ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। পশ্চিমা ও ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত এই তথ্যকে বিশ্লেষকরা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চের শেষ দিকে সৌদি বিমান বাহিনী এসব হামলা পরিচালনা করে। তবে হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। পশ্চিমা এক কর্মকর্তার দাবি, সৌদি ভূখণ্ডে হওয়া হামলার প্রতিক্রিয়াতেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেয় রিয়াদ।
ঘটনার বিষয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সরাসরি কিছু স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। একইভাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
রয়টার্স বলছে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল সৌদি আরব সাম্প্রতিক সংঘাতে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর এবং তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রিয়াদ আরও কঠোর অবস্থানে যেতে শুরু করে।
এ সময় হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয় বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উঠে আসে।
তবে সৌদি আরব ও আমিরাতের কৌশলে পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। আবুধাবি তুলনামূলক আক্রমণাত্মক অবস্থান নিলেও রিয়াদ প্রকাশ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাতে থাকে। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রাখে সৌদি সরকার। রিয়াদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছিল বলেও জানা গেছে।
পশ্চিমা ও ইরানি সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গোপন হামলার পর সৌদি আরব ইরানকে আরও কঠোর জবাবের সতর্কবার্তা দেয়। এরপরই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ে এবং ধীরে ধীরে উত্তেজনা প্রশমনের একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা তৈরি হয়।
বিশ্লেষক আলি ভাইজের মতে, উভয় পক্ষই বুঝতে পেরেছিল যে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে। সেই উপলব্ধি থেকেই উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ জোরদার হয়।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যেও যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা সৌদি আরব ও ইরান যথাক্রমে সুন্নি ও শিয়া শক্তির প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। যদিও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছিল।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্চের শেষ সপ্তাহে দেশটিতে ১০৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটলেও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তা নেমে আসে প্রায় ২৫টিতে। পশ্চিমা সূত্রগুলোর ধারণা, পরবর্তী বেশিরভাগ হামলা ইরাকভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো চালায় এবং ইরান সরাসরি সম্পৃক্ততা কমিয়ে আনে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির শুরুর দিকেও সৌদি আরবের দিকে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন পাকিস্তান সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে এবং সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানায়।








