দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস এখন প্রবাসী আয়। কোটি কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এখনো প্রবাসী খাতকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন, অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠা এই খাত কেন এখনো জাতীয় পরিকল্পনায় প্রান্তিক অবস্থানে থাকবে?
উন্নত জীবনের আশায় এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবছর লাখো বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি জমান। তাদের পাঠানো অর্থ শুধু পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও বড় ভূমিকা রাখছে। তবে প্রবাসীদের অভিযোগ, দেশের অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখার পরও তারা প্রত্যাশিত মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩২ বিলিয়ন ৭৬ কোটি ডলার। একই সময়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ৩১ কোটি ডলার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, পোশাক খাতের আয়ের একটি বড় অংশ কাঁচামাল আমদানি ও অন্যান্য ব্যয়ের মাধ্যমে বিদেশে চলে যায়, যেখানে রেমিট্যান্সের বেশিরভাগ অর্থ সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়।
জনশক্তি রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা পেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বর্তমানের তুলনায় আরও অনেক বেশি বাড়ানো সম্ভব। কমফোর্ট ওভারসিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহেদী হাসানের ভাষ্য, বর্তমানে যে পরিমাণ বৈদেশিক আয় আসছে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে তা দ্বিগুণ করাও অসম্ভব নয়।
তার অভিযোগ, প্রবাসীদের জন্য রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ সীমিত। এমনকি যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন, সেই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও নীতিগত স্বীকৃতি বা প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরসহ গত পাঁচ বছরে জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র ০.১৫ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত। অথচ প্রতিবছর এই খাত থেকেই দেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হচ্ছে।
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটা মূলত মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে ব্যয় হয়। বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরাসরি কোনো সুবিধা পান না। বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরীর দাবি, সরকারি সহায়তা ছাড়াই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিদেশি চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ। এজন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে প্রণোদনার আওতায় আনা এবং বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বৈধভাবে ডলার ব্যয়ের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মেহেদী হাসান বলেন, ফিলিপাইন ও নেপালের মতো দেশগুলো দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠিয়ে তুলনামূলক বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করছে। বাংলাদেশ থেকে এখনও অধিকাংশ কর্মী স্বল্প দক্ষতায় বিদেশে যাচ্ছেন। ফলে তাদের আয় কম এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও সীমিত থেকে যাচ্ছে।
একই মত প্রকাশ করে আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, অন্যান্য রপ্তানি খাতের মতো জনশক্তি রফতানি খাতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ দক্ষ জনশক্তি তৈরি ছাড়া ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে বাজেটে প্রবাসী খাতের জন্য বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
অভিবাসন খাত বিশ্লেষক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ মনে করেন, জাতীয় বাজেটের অন্তত ১ শতাংশ এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত। তা সম্ভব না হলে কমপক্ষে ০.৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং কম সংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠিয়েও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে (টিটিসি) ব্যয় করে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজারে টিকে থাকতে দক্ষতাই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।








