শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

এক মিনিটে দুই ভূমিকম্প, ধ্বংসস্তূপ ভেনেজুয়েলা: কী কারণে এত বড় বিপর্যয়?

মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, বহু ভবন ধস এবং হতাহতের ঘটনায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত ৩২ জন নিহত এবং কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছেন। তবে উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথম কম্পনের কেন্দ্র ছিল ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপে এলাকায়। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।

কেন ঘটল এই জোড়া ভূমিকম্প?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ক্যারিবীয় এবং দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেট পরস্পরের সংস্পর্শে রয়েছে। এই দুই প্লেটের সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাপ সঞ্চিত হচ্ছিল।

ইউএসজিএস জানিয়েছে, বড় ভূমিকম্পটি ঘটেছে ‘অগভীর স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং’-এর কারণে। সহজ ভাষায়, ভূত্বকের দুটি অংশ পাশাপাশি অনুভূমিকভাবে সরে গেলে যে ধরনের শক্তি নির্গত হয়, তার ফলেই এ ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বুধবারের জোড়া কম্পন একটি জটিল ভূগর্ভস্থ ভঙ্গুরতা-বিস্তার প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত বহন করছে।

কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
ভূমিকম্পের পর ইতোমধ্যে প্রায় দুই ডজন আফটারশক অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, আগামী কয়েক দিন আরও শক্তিশালী পরাঘাত হতে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন বা অবকাঠামোতে নতুন করে ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ইউএসজিএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের অনেক স্থাপনা অপরিবর্ধিত ইটের গাঁথুনি এবং অ্যাডোবি নির্মাণশৈলীতে তৈরি, যা শক্তিশালী ভূমিকম্পে সহজেই ভেঙে পড়তে পারে। এ কারণেই প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কোথায়?
রাজধানী কারাকাসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে আলতামিরা ও এল প্যারাইসো এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া লা গুইরা এবং মধ্য ভেনেজুয়েলার আরও কয়েকটি অঞ্চলে ভবন ধস ও অবকাঠামোগত ক্ষতির তথ্য মিলেছে।

কারাকাসের একটি ২২ তলা ভবন ধসে পড়ার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছেন জরুরি সেবাকর্মীরা। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছে।

সরকারের পদক্ষেপ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভেনেজুয়েলা সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে রাজধানীর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে এবং জরুরি সেবাকর্মীদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রাখা হয়েছে।

কম্পন অনুভূত হয়েছে প্রতিবেশী দেশেও
যদিও ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল ইয়ারাকুই রাজ্যে, তবে এর কম্পন রাজধানী কারাকাস ছাড়াও কারাবোবো, মিরান্ডা, লা গুয়াইরা ও ট্রুহিলোসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় অনুভূত হয়েছে। প্রতিবেশী কলম্বিয়া এবং দূরবর্তী ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চল থেকেও কম্পন টের পাওয়ার খবর এসেছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার হাত
ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

এল সালভাদর ৩০০ উদ্ধারকর্মী ও প্যারামেডিক পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ৫০ টন চিকিৎসা সামগ্রী ও জরুরি সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইকুয়েডর, পানামা, মেক্সিকো ও ব্রাজিলও মানবিক সহায়তা এবং সংহতির বার্তা দিয়েছে।

আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা?
ইউএসজিএসের প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। সংস্থাটির পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাসে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এসব হিসাব চূড়ান্ত নয়, তবু পরিস্থিতির সম্ভাব্য ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উদ্ধার অভিযান ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার এই ভূমিকম্পের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে না। তবে এক মিনিটেরও কম সময়ে সংঘটিত দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *