মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সবশেষ

অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল দক্ষিণ আফ্রিকা, প্রবাসীদের দোকানে ভাংচুর-লুটপাট

অবৈধ অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে চরম সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় নামার আশঙ্কা থাকলেও সকাল পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সহিংস ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে প্রবাসী বাংলাদেশি অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীরা সেসব দোকান থেকে লুটপাটও করছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসী।

এর আগে, ২৫ হাজারের বেশি বিদেশিকে বাসে করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে আরও হাজার হাজার অভিবাসী নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, দূতাবাস ও অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে।

২০০৮ ও ২০২১ সালের ভয়াবহ সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। হাজার হাজার পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, যার ব্যয় ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন র‌্যান্ড ছাড়িয়েছে। অতীতের ওই দুই ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।

সোমবার রাতজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা ও শান্তির আহ্বান জানানো হয়, যাতে সম্ভাব্য সহিংসতা এড়ানো যায়।

মঙ্গলবার ভোর থেকেই প্রদেশভিত্তিক পুলিশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এখন পর্যন্ত অধিকাংশ এলাকাই শান্ত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

গৌতেং, ইস্টার্ন কেপ, ওয়েস্টার্ন কেপ, লিম্পোপো ও মপুমালাঙ্গাসহ প্রায় সব প্রদেশেই পুলিশ জানিয়েছে, সকালের দিকে বড় কোনো ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর সঙ্গে বিক্ষোভের সরাসরি যোগ নেই বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে কিছু এলাকায় আগে থেকেই সম্ভাব্য অস্থিরতার সতর্কতা রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল ও কিছু বড় শহরে নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত নজরদারি চালাচ্ছে।

জাতীয় জয়েন্ট অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স স্ট্রাকচার (Natjoints) জানিয়েছে, তাদের দেশব্যাপী অভিযান পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে। সংস্থাটির মতে, এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি বিদেশিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০৩টি অভিবাসনবিরোধী সহিংস ঘটনার রেকর্ড হয়েছে এবং ১৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, বিক্ষোভের অধিকার থাকলেও তা অবশ্যই শান্তিপূর্ণ হতে হবে। সহিংসতা বা আইনভঙ্গের চেষ্টা করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে নির্ধারিত স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে অস্ত্র বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে জোহানেসবার্গ, প্রিটোরিয়া, ডারবান, কেপ টাউন, এমালাহলেনি, টজানিন, ক্রুনস্টাড ও কিম্বারলি।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আগেই কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে জোহানেসবার্গ সিবিডি ও হিলব্রো, গৌতেংয়ের প্রধান মহাসড়ক, ডারবান-পিটারমারিটজবার্গ রুট, এবং পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলীয় কিছু এলাকা।

অন্যদিকে অভিবাসীদের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে বা অস্থায়ী আশ্রয়ে অবস্থান করছে। কেপ টাউনে দুই হাজারের বেশি জিম্বাবুয়ান নাগরিক একটি অভিবাসন কেন্দ্রে অপেক্ষা করছে।

ডারবানে প্রায় সাত হাজার মালাউই নাগরিককে বাসে করে পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। ইস্টার্ন কেপে শত শত মানুষকে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে এবং আরও অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

সামাজিকভাবে সবচেয়ে চাপের মুখে থাকা অভিবাসীদের অনেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ স্বদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও সেখানে জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

একই সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে বেকারত্ব ও সামাজিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, অধিকাংশ কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।

গত কয়েক দিনে দেশজুড়ে ব্যাপক সংখ্যক গ্রেপ্তার অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। এ সময়ে হাজার হাজার অপরাধমূলক অভিযোগের পাশাপাশি অনথিভুক্ত অভিবাসীদেরও আটক করা হয়েছে।

সরকার ও প্রাদেশিক প্রশাসনগুলো বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং জননিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও সম্ভাব্য বিঘ্ন এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

শ্রম বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যেহেতু এটি স্বীকৃত ধর্মঘট নয়, তাই কর্মীরা কাজে অনুপস্থিত থাকলে বেতন কাটা যেতে পারে।

অন্যদিকে বিভিন্ন শ্রম সংগঠন ও অভিবাসনবিরোধী জোট এই সময়সীমাকে ঘিরে সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। অভিবাসনপন্থীরা আবার বলছেন, সমস্যার মূল কারণ অভিবাসন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।

দেশটির অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি ইমরান হোসেন রাজু ‘প্রবাস কথা’কে জানিয়েছেন, বেশকিছু দিন ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন চলছে। এতে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির দোকানপাটে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়েছে। একপর্যায়ে এসব দোকানপাট থেকে লুটপাটও করছে স্থানীয় আন্দোলনকারীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *