ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কাছাকাছি দুটি বিমানঘাঁটিতে একসঙ্গে অন্তত ১১টি জে-২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে চীন। নতুন স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়া এই মোতায়েনকে ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বার্তা হিসেবে দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
আমেরিকান স্পেস ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি ভ্যান্টরের স্যাটেলাইট চিত্রের বরাত দিয়ে সোমবার (২৭ জুলাই) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ জুলাই ধারণ করা একটি স্যাটেলাইট ছবিতে চীনের জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের হোতান বিমানঘাঁটিতে সাতটি জে-২০ যুদ্ধবিমান দেখা যায়। ঘাঁটিটি ভারতের লাদাখের লেহ থেকে প্রায় ৩৮৯ কিলোমিটার এবং দৌলত বেগ ওল্ডি বিমানঘাঁটি থেকে মাত্র ২৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এনডিটিভির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের মুখোমুখি কোনো চীনা বিমানঘাঁটিতে একসঙ্গে এত বেশি জে-২০ মোতায়েনের ঘটনা এটিই প্রথম, যা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়েছে।
আরেকটি স্যাটেলাইট ছবিতে তিব্বতের লাসা অঞ্চলের দামশুং বিমানঘাঁটিতে আরও চারটি জে-২০ যুদ্ধবিমান শনাক্ত করা হয়েছে। এই ঘাঁটিটি অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং থেকে প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
ভারতের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউস্পেসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক যুদ্ধবিমানচালক সমীর যোশীর মতে, হোতান ও দামশুংয়ে মোট ১১টি জে-২০ মোতায়েনের অর্থ হলো, সীমান্তসংলগ্ন উচ্চভূমির ঘাঁটি থেকে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমানের নিয়মিত কার্যক্রম এখন চীনা বিমানবাহিনীর অপারেশনাল বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, এটি শুধু শক্তি প্রদর্শনের বিষয় নয়।
তিনি আরও বলেন, উত্তর সীমান্তে স্টেলথ যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাই কাউন্টার-স্টেলথ সেন্সর, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
জে-২০ চীনের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান। বিশেষ নকশার কারণে এটি রাডারে সহজে শনাক্ত হয় না, ফলে প্রতিপক্ষের আকাশসীমায় প্রবেশ ও অভিযান পরিচালনায় কৌশলগত সুবিধা পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের হাতে ফরাসি নির্মিত রাফাল যুদ্ধবিমান থাকলেও সেগুলো স্টেলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন নয়। ফলে জে-২০-এর মতো স্টেলথ প্ল্যাটফর্ম মোকাবিলায় ভারতের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এদিকে ভারতের নিজস্ব স্টেলথ যুদ্ধবিমান প্রকল্প অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এএমসিএ) এখনও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। প্রযুক্তিগত যাচাই সম্পন্ন হলেও এটি বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হতে আরও প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষণমাধ্যম দ্য ওয়ার জোন জানিয়েছে, ২০১৯ সালে চীনের কাছে প্রায় ৫০টি জে-২০ যুদ্ধবিমান ছিল। ২০২২ সালের শেষ নাগাদ সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০০-তে পৌঁছায়।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের জে-২০ যুদ্ধবিমানের বহর এক হাজারে পৌঁছাতে পারে।
তবে ভারত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় জে-২০-এর উপস্থিতি এবারই প্রথম নয়। ২০১৬ সালে তিব্বতের দাওচেং ইয়াদিং বিমানবন্দরে প্রথম এই যুদ্ধবিমান দেখা যায়। পরে ২০২৪ সালের মে মাসে সিকিম সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে শিগাতসে বিমানঘাঁটিতেও জে-২০ অবতরণ করতে দেখা যায়।
বর্তমানে ভারতের বিমানবাহিনীর দুটি স্কোয়াড্রনে মোট ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান রয়েছে, যার ঘাঁটি হরিয়ানার আমবালা ও পশ্চিমবঙ্গের হাশিমারা। এছাড়া ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ৭.৫ বিলিয়ন ডলারে আরও ২৬টি রাফাল কেনার চুক্তি হয়েছে। একই সঙ্গে বিমানবাহিনীর জন্য ৩৬ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১১৪টি অতিরিক্ত রাফাল কেনার প্রক্রিয়াও চলমান।
এর পাশাপাশি ভারতীয় বিমানবাহিনী ২৬০টির বেশি রাশিয়ান সুখই-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে, যেগুলো ধাপে ধাপে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। বহরে আরও রয়েছে মিরাজ-২০০০ ও মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান।








