বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে চাপে সৌদি আরব, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির দ্বৈত সংকটে রিয়াদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের শুরুতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলার কৌশল নিয়েছিল সৌদি আরব। তবে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার ধারাবাহিকতায় সেই অবস্থান এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। রিয়াদের দাবি, ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সৌদি ভূখণ্ডে একের পর এক ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরাকে ওই গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি নেতৃত্বের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সামরিক প্রতিক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে, নাকি উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক পথেই এগোনো হবে।

সংঘাতে কারা কোন অবস্থানে
বর্তমান সংঘাতে একদিকে রয়েছে ইরান ও ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে সক্রিয় রয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। পাশাপাশি ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযোগ, তারা দেশটিতে অন্তত ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক যৌথ হামলার লক্ষ্যও ছিল এই গোষ্ঠী।

ইরানপন্থী জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ থাকলেও বর্তমানে তাদের ভূমিকা তুলনামূলক সীমিত।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পক্ষের সঙ্গে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম), সৌদি আরব, উপসাগরীয় কয়েকটি আরব দেশ এবং জর্ডান। যদিও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তবু বর্তমান সংঘাতে দেশটি সরাসরি অংশ নেয়নি।

আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের পরিধি এখন আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। ইরান সম্প্রতি জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নতুন বিধিনিষেধ অমান্য করে চলাচলকারী জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ইয়েমেনের হুতিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা না হলে এই সংকট আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেন উদ্বিগ্ন রিয়াদ
সৌদি যুবরাজ ও কার্যত দেশটির শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্প গড়ে তোলা এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

তবে ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ডেটা সেন্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

তেল স্থাপনায় হামলার স্মৃতি
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আবকাইক ও খুরাইসের তেল স্থাপনায় বড় ধরনের ড্রোন হামলায় কয়েক দিনের জন্য সৌদি আরবের প্রায় অর্ধেক তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হয়েছিল। প্রথমদিকে হামলার দায় হুতিদের ওপর দেওয়া হলেও পরে বিভিন্ন বিশ্লেষণে ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সম্প্রতি প্রকাশিত উপগ্রহচিত্রেও আবকাইক স্থাপনায় নতুন করে ড্রোন হামলার আলামত দেখা গেছে বলে দাবি করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তাদের অভিযোগ, এ হামলার পেছনেও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হাত রয়েছে।

তেল রপ্তানির পথেও বাড়ছে ঝুঁকি
সৌদি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি এখনো তেল রপ্তানি। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিধিনিষেধের কারণে রিয়াদ পূর্বাঞ্চল থেকে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পাঠিয়ে সেখান থেকে এশিয়ার বাজারে রপ্তানি করছে।

তবে সেই বিকল্প পথও এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর অভিযানের পর হুতিরা সৌদি আরবের আবহা ও জিজান বিমানবন্দরে পাল্টা হামলা চালায়। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলও লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে।

এর ফলে বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা এশিয়ায় সৌদি তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।

পুরোনো সংঘাতের নতুন বাস্তবতা
ইয়েমেনে দীর্ঘ সাত বছরের সামরিক অভিযান চালিয়েও হুতিদের পরাজিত করতে পারেনি সৌদি আরব। ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে।

এখন দক্ষিণে হুতিদের হামলা এবং উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার দিক থেকেই নিরাপত্তা চাপের মুখে পড়েছে সৌদি আরব।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন বহুমুখী নিরাপত্তা সংকট ‘ভিশন ২০৩০’-এর পরিকল্পনায় ছিল না। ফলে একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া, এই দুইয়ের মধ্যে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে রিয়াদকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *