ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টানা ৩২ ঘণ্টার যানজট ও তাতে জনদুর্ভোগের ঘটনা নিয়ে এবার প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। তার অভিযোগ, প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী অংশ বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সামনে ‘ঘোর অন্ধকার’ অপেক্ষা করছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন শাহাদাত হোসেন সেলিম। একই সঙ্গে পরে তিনি জানান, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা সরকারকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ তিনি আগেও প্রকাশ্যে তুলেছেন।
৩২ ঘণ্টার যানজট, চরম ভোগান্তিতে যাত্রীরা
শাহাদাত হোসেন সেলিমের বক্তব্যের পেছনে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাম্প্রতিক ভয়াবহ যানজট। তার দাবি, গত শুক্রবার রাত থেকে চান্দিনা থেকে নারায়ণগঞ্জের আষাড়িয়ারচর পর্যন্ত প্রায় ৩২ ঘণ্টা সড়কে তীব্র যানজট ছিল।
দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থেকে চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। তার পোস্ট অনুযায়ী, যানজটে আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। আবার যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পেরে কয়েকজন প্রবাসী তাদের ফ্লাইটও মিস করেন।
এমন পরিস্থিতির পর প্রশ্ন ওঠে, সড়ক সংস্কার বা মেরামতের কাজের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কতা ছিল কি না, আর থাকলে এত দীর্ঘ যানজট কীভাবে তৈরি হলো?
কর্মকর্তাদের বৈঠকে ‘দায়বদ্ধতার ঘাটতি’ দেখেছেন সেলিম
ঘটনার কারণ খুঁজতে জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, হাইওয়ে পুলিশ এবং সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল সভা করেন বলে জানান সেলিম।
ওই সভায় হুইপের পাশে বসে পুরো আলোচনা পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে সভায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আচরণে তিনি হতাশ হয়েছেন।
সেলিমের ভাষ্য, এত বড় একটি ঘটনা এবং মানুষের ব্যাপক ভোগান্তির পরও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি ‘বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা দায়বদ্ধতা’ দেখতে পাননি।
তার এই পর্যবেক্ষণ থেকেই প্রশাসনের সমন্বয় ও জবাবদিহির প্রশ্নটি সামনে আসে।
আগে জানালে বিকল্প পথে যেতে পারতেন যাত্রীরা
সেলিমের পোস্ট অনুযায়ী, হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানও বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেন। তার মতে, সেতু সংস্কারের কাজ শুরুর আগে সাধারণ মানুষকে আগাম জানানো প্রয়োজন ছিল।
সংবাদপত্র, টেলিভিশনের স্ক্রল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হলে অনেক যাত্রী বিকল্প পথ বেছে নিতে পারতেন এবং এমন ভয়াবহ যানজট এড়ানো সম্ভব হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অর্থাৎ, সেলিমের বক্তব্যে শুধু যানজটের তীব্রতাই নয়, এটি মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা ও তথ্যপ্রচারের ঘাটতিকেও বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
‘দায়িত্বহীন চক্র’ চিহ্নিত করার দাবি
শাহাদাত হোসেন সেলিমের অভিযোগ, প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, এই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন চক্র’কে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
আগেও প্রশাসনের ভেতরের ‘দোসরদের’ নিয়ে অভিযোগ
প্রশাসন নিয়ে সেলিমের এমন মন্তব্য অবশ্য এবারই প্রথম নয়। গত আগস্টে দেওয়া আরেক ফেসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ‘পতিত স্বৈরাচারের দোসররা’ এখনো সক্রিয় এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তারা বাধা সৃষ্টি করছে।
এবারের পোস্টে সেই অভিযোগের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মহাসড়কের যানজট ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার প্রসঙ্গ।
ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা সরকারকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। সরকারকে সতর্ক করতেই তিনি বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আনছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, সরকারের উচিত এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
এলডিপি থেকে বিএনপিতে
শাহাদাত হোসেন সেলিম আগে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। পরে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ফলে মহাসড়কের একটি জনদুর্ভোগের ঘটনা নিয়ে তার সর্বশেষ বক্তব্য শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন তুললেন তিনি।








