তিন দেশের নতুন প্রতিরক্ষা জোট আনুষ্ঠানিক কাঠামো পাওয়ার পথে। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় গঠিত কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আজ সোমবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বসছে। জোটের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং যৌথ উদ্যোগের কাঠামো নির্ধারণে বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চলতি মাসের শুরুতে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির মূল বিষয় হলো, তিন দেশের যেকোনো একটি আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সহায়তা দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এবং তেহরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার প্রেক্ষাপটে এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম বৈঠকেই আসতে পারে নতুন কাঠামোর রূপরেখা
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় গঠিত ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ আজ প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসছে।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে জোটের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি। যৌথভাবে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য একটি সচিবালয় ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাঠামো কীভাবে কাজ করবে, তার রূপরেখা নির্ধারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
পাশাপাশি আগামী সময়ে জোটের পক্ষ থেকে কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেসব নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনাও নির্ধারণ করা হতে পারে।
নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পে নজর
শুধু কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে সামরিক সহায়তা দেওয়ার কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না তিন দেশ। আজকের আলোচনায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এর সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে। যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ তৎপরতা জোরদারের বিষয়টিও আলোচনার অংশ হতে পারে।
বৈঠকে থাকছেন তিন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলের এবং সেনাপ্রধান জেনারেল সেলচুক বায়রাকতারওগ্লু বৈঠকে অংশ নেবেন বলে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।
পাকিস্তানের পক্ষে বৈঠকে থাকবেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তাঁরা ইতোমধ্যে তুরস্কে পৌঁছেছেন।
সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলে থাকার কথা রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ফাইয়াদ বিন হামেদ আল-রুওয়াইলির।
তিন দেশের সামরিক শক্তির সমীকরণ
নতুন এই জোটের গুরুত্ব শুধু চুক্তির শর্তে নয়, সদস্য তিন দেশের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানেও।
ন্যাটোতে যুক্ত তুরস্ক পশ্চিমা সামরিক জোটটির দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি। অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। আর সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র।
ফলে এই তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা রাজনীতিতে এর প্রভাব তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জোটটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের দিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে।
বাংলাদেশের আগ্রহ কতটা এগোল
তিন দেশের জোটের প্রথম বৈঠকের মধ্যেই বাংলাদেশও এতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
রোববার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তার দাবি, এ বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান ইতিবাচক এবং বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে সরকার কোনো ঝুঁকি দেখছে না।
এখন মূল প্রশ্ন, আজকের বৈঠকে জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কতটা স্পষ্ট হয় এবং ভবিষ্যতে নতুন সদস্য নেওয়ার বিষয়ে কোনো নীতিগত পথ তৈরি হয় কি না। কারণ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করলেও তিন দেশের বাইরে জোটের পরিধি কীভাবে বাড়ানো হবে, সেটিই পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।








