সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সংসদে ১০ দফা দাবি

বিদেশে যাওয়ার পর বাংলাদেশি কর্মীদের নানা সংকটের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি এবার জাতীয় সংসদে আলোচনায় এসেছে। ই-পাসপোর্টের তথ্যগত জটিলতা থেকে শুরু করে সৌদি আরবে অপহরণ, দালালের প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, মেডিকেল পরীক্ষায় অনিয়ম এবং অসুস্থ ও মৃত প্রবাসীদের সহায়তার জন্য সরকারের কাছে ১০ দফা পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে দেওয়া মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, প্রবাসীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের অগ্রাধিকার শুধু বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, প্রবাসীদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করাও।

কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া ‘সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের সমস্যা সমাধান প্রসঙ্গে’ নোটিশটি দেন।

পাসপোর্ট থেকে মরদেহ ফেরানো, একসঙ্গে ১০ সংকট
সংসদে দেওয়া নোটিশে প্রবাসীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের সংকট তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ই-পাসপোর্ট জটিলতা, সৌদি আরবে অপহরণ ও নির্যাতন, দালাল চক্রের প্রতারণা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গামকা মেডিকেল পরীক্ষায় অনিয়ম, বিএমইটির দুর্নীতি, অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দূতাবাস থেকে সরাসরি সহায়তা এবং অসুস্থ ও মৃত প্রবাসীদের সরকারি সহায়তা।

মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে। অথচ বিদেশে গিয়ে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও প্রশাসনিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন।

সামান্য তথ্যের ভুলে আটকে যাচ্ছে ই-পাসপোর্ট
নোটিশে ই-পাসপোর্ট নিয়ে প্রবাসীদের ভোগান্তির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। এনআইডি কিংবা জন্মনিবন্ধনের তথ্যের সামান্য অসঙ্গতির কারণে অনেকের পাসপোর্ট আটকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের ইকামা নবায়ন এবং ব্যাংকিং সেবায়।

এ সমস্যা কাটাতে দূতাবাসগুলোতে বিশেষ ই-পাসপোর্ট সেল চালু এবং আগের এমআরপি পাসপোর্টের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নবায়নের সুবিধা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

সৌদিতে নিরাপত্তা ও প্রতারণা নিয়েও উদ্বেগ
সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও নোটিশে গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ঘটনা ঠেকাতে বাংলাদেশি দূতাবাস এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে দালালদের প্রতারণার শিকার প্রবাসীদের দ্রুত বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং সরকারি আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

বিদেশ যাওয়ার আগেই বাড়ছে ব্যয়ের চাপ
শুধু বিদেশে গিয়ে নয়, কর্মসংস্থানের জন্য দেশ ছাড়ার আগেই নানা ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন কর্মীরা অভিযোগও উঠে এসেছে সংসদে।

অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বৈধ ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

গামকা মেডিকেল পরীক্ষায় অনিয়ম এবং ‘ফিট-আনফিট’ বাণিজ্য বন্ধের পাশাপাশি বিএমইটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি প্রতিরোধের দাবিও রয়েছে ১০ দফায়।

বিদেশে বিপদে পড়লে দূতাবাসকে পাশে চান প্রবাসীরা
নোটিশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশে বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসকেন্দ্রিক সরাসরি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি।

প্রবাসীদের আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা দ্রুত দেওয়ার পাশাপাশি অসুস্থ কর্মীদের চিকিৎসা ব্যয় বহনে সরকারি সহায়তা এবং মৃত্যুর পর মরদেহ দ্রুত ও বিনা খরচে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে।

‘সমস্যাগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই’
জবাবে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া প্রবাসীদের সমস্যাগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করেছেন। এসব বিষয় তুলে ধরতে তাকে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সমস্যাগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করাকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী জনশক্তি প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছ থেকে কর্মীর চাহিদা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সেই চাহিদার ভিত্তিতে ‘ডিমান্ড ম্যাপিং’ করে প্রয়োজনীয় জনশক্তি প্রস্তুত করা হবে।

প্রবাসীদের কর্মসংস্থানকে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে নুরুল হক নুর বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করাও সরকারের বড় অগ্রাধিকার।

সংসদের আলোচনায় ওঠা ১০ দফা মূলত প্রবাসী জীবনের পুরো চক্রের সমস্যাকেই সামনে এনেছে, বিদেশ যাওয়ার খরচ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পাসপোর্ট, কর্মস্থলের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে ফেরানো পর্যন্ত। এখন এসব দাবির কতটা বাস্তবায়ন হয়, সেটিই প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *