রাজধানীর সবুজবাগে বান্ধবীর বাসায় দেখা করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন কাতারপ্রবাসী সিফাত উল্লাহ (২৭)। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আদর্শপাড়া এলাকায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার পর সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন।
তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ নিয়ে সামনে এসেছে পরস্পরবিরোধী দুটি বক্তব্য। নিহতের বান্ধবী নাজিফা শেখের অভিযোগ, পূর্বশত্রুতার জেরে একটি দল বাসায় ঢুকে সিফাতকে টেনেহিঁচড়ে বের করার চেষ্টা করে এবং পরে কুপিয়ে জখম করে। অন্যদিকে আহত রাজিব ওরফে রাব্বি দাবি করেছেন, ওই বাসায় অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে তারা সেখানে গেলে সিফাতই প্রথম তাদের ওপর হামলা করেন।
বাসার ভেতর থেকে শুরু, শেষ হাসপাতালে
নাজিফা শেখের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেলে আদর্শপাড়ার ওই বাসায় তার সঙ্গে দেখা করতে যান সিফাত। কিছুক্ষণ পর জয়, রাজিব, ইয়াসিনসহ ৬-৭ জন সেখানে জোর করে প্রবেশ করেন।
তাদের সঙ্গে সিফাতের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামানোর চেষ্টা করা হয়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সিফাতকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করা হয় বলে অভিযোগ নাজিফার।
গুরুতর আহত অবস্থায় সিফাতকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেক) নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।
সম্পর্কের জেরেই কি হামলা?
নাজিফা জানান, প্রায় দুই বছর ধরে সিফাতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এবং দুই পরিবারের মধ্যে তাদের বিয়ের কথাও চলছিল।
তার অভিযোগ, জয় নামের যুবকটি এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত এবং ওই বাসায় মাদক সেবনের আড্ডা বসাত। সিফাত এতে বাধা দেওয়ায় জয়ের সঙ্গে তার পূর্বশত্রুতা তৈরি হয়। সেই বিরোধের জেরেই হামলাটি হয়ে থাকতে পারে বলে দাবি করেন নাজিফা।
তবে তার এই বক্তব্যের বিপরীতে রয়েছে ঘটনায় আহত রাজিব ওরফে রাব্বির দাবি।
আহত রাজিবের বক্তব্য ভিন্ন
রাজিবের ভাষ্য, ওই বাসায় অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে তারা সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর সিফাত তাদের ওপর প্রথমে চড়াও হন এবং ছুরিকাঘাত করেন বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর হাতাহাতির একপর্যায়ে দুজন আহত হন বলে জানান রাজিব। অর্থাৎ হামলার সূচনা কীভাবে এবং কার পক্ষ থেকে এই প্রশ্নে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কাতার থেকে দেশে এসে শেষ পরিণতি
সিফাতের বাড়ি যাত্রাবাড়ীর ধোলাইপাড় এলাকায়। তার বাবা জয়নাল আবেদীন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সিফাত কাতারে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিদেশে ব্যবসা করা এই যুবকের রাজধানীতে একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী সংঘর্ষে গড়াল। কিন্তু কেন তাকে লক্ষ্য করে হামলা করা হলো, কারা হামলায় সরাসরি জড়িত এবং ঘটনার প্রকৃত সূত্রপাত কোথায়, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তদন্তে মিলবে ঘটনার আসল কারণ
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, সিফাতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে রাখা হয়েছে। ঘটনাটি সবুজবাগ থানাকে জানানো হয়েছে এবং পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, নাজিফার অভিযোগ অনুযায়ী পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিত হামলা, নাকি রাজিবের দাবি অনুযায়ী একটি বিরোধ থেকে আকস্মিক সংঘর্ষ? প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের তথ্য ও অন্যান্য আলামত যাচাইয়ের পরই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হতে পারে।








