সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

সৌদি-জর্ডানের বাইরে নারী কর্মীদের জন্য খুলছে নতুন বাজার

বিদেশে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের কর্মসংস্থানের চিত্র ধীরে ধীরে বদলানোর আভাস মিলছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও জর্ডাননির্ভর থাকা এই শ্রমবাজারে এখন নতুন গন্তব্য ও পেশা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে জাপান ও হংকংয়ের মতো দক্ষ শ্রমবাজারে নারীদের পাঠানোর দিকে নজর দিচ্ছে সরকার।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ থেকে ৪৮টি দেশে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন ৪২ হাজারের বেশি নারী। তবে এর ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরব ও জর্ডানে। অর্থাৎ দেশসংখ্যা বাড়লেও নারী কর্মসংস্থানের বড় অংশ এখনো দুটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

এ অবস্থায় গৃহকর্মের বাইরে নতুন পেশায় নারীদের যুক্ত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কেয়ারগিভার ও হাউসকিপিংয়ের মতো কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দক্ষতা বাড়ানো গেলে নতুন শ্রমবাজারে বাংলাদেশি নারীদের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কমে যাওয়ার পর আবার বাড়ছে নারী কর্মীর বিদেশযাত্রা
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৩১৭ জনে। তিন বছরের ব্যবধানে নারী কর্মী বিদেশে যাওয়ার হার কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ।

তবে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সময়ে ৫ হাজার ২১৪ জন বেশি নারী বিদেশে গেছেন। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪ শতাংশ।

এই প্রবৃদ্ধিকে সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তাদের মতে, শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। কোন দেশে কোন ধরনের দক্ষ কর্মীর চাহিদা আছে, সেই অনুযায়ী বাজার ও প্রশিক্ষণ তৈরি করতে হবে।

নতুন বাজারের দিকে সরকারের নজর
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি জাপান ও হংকংয়ের মতো দক্ষ কর্মীর শ্রমবাজারে নজর দিয়েছে সরকার।

এ জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কেয়ারগিভার বা সেবাযত্ন এবং হাউসকিপিং বা গৃহপরিচর্যার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

এ উদ্যোগ সফল হলে নারী কর্মীদের জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ শুধু গৃহকর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্দিষ্ট দক্ষতা নিয়ে তারা নতুন ধরনের কাজেও প্রবেশের সুযোগ পাবেন।

কেন দরকার নতুন বাজার?
নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রার বর্তমান চিত্রে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৪৮টি দেশে নারী কর্মী গেলেও তাদের ৯০ শতাংশের বেশি গেছেন মাত্র সৌদি আরব ও জর্ডানে। ফলে এই দুই বাজারে কোনো ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে বাংলাদেশের নারী কর্মসংস্থানে।

অন্যদিকে, বিদেশফেরত অনেক নারী কর্মী যে অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, সেটিও নতুন বাজার তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনছে।

শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, একাধিক বাড়িতে কাজ করানো, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম বা অনিয়মিত বেতন এবং পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকে।

দক্ষতা না বাড়ালে নতুন বাজারেও ঝুঁকি থাকবে
অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু নতুন দেশে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নারী কর্মীদের ভাষা ও কাজের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

কারণ অনেক নারী কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা ভাষাজ্ঞান নিয়ে যেতে পারেন না। ফলে কাজের পরিবেশে তারা নানা সমস্যায় পড়েন।

অন্যদিকে, কিছু নিয়োগকর্তা চুক্তিতে উল্লেখ করা কাজের বাইরে একাধিক বাড়িতে কাজ করান এবং নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাই নতুন বাজার তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

নিরাপদ কর্মপরিবেশ ছাড়া নতুন বাজার কতটা কাজে আসবে?
এই প্রশ্নটিও সামনে রাখছেন সংশ্লিষ্টরা। মানিকগঞ্জের অঞ্জনা গত ২০ মার্চ সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন। সেখানে ছিলেন মাত্র এক মাস তিন দিন। এর মধ্যে পাঁচ দিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। বাকি সময় সৌদির একটি রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

এর আগে ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে লেবানন, জর্ডান, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে কাজ করেছেন অঞ্জনা। তার ভাষ্য, আগের কোনো দেশে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।

নরসিংদীর সানজীদা আখতারের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের। সৌদিতে দুই মাস ২৫ দিন থাকার সময় যে বাসায় কাজ করতেন, তার বাইরে নিয়োগকর্তার মায়ের বাসা ও শ্বশুরবাড়িতেও তাকে কাজ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। পরে নানা নিপীড়নের শিকার হয়ে নিজের টাকা খরচ করে দেশে ফেরেন তিনি।

এসব অভিজ্ঞতা অন্য নারী কর্মীদের মধ্যেও বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৩ দেশে আইনি সহায়তা, সৌদিতে সেফ হোম
নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই সরকার বলছে, তাদের সুরক্ষায় কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নারীদের ভয় কমাতে ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা চালু করা হয়েছে। সৌদি আরবে সেফ হোমও রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বাজারে যাওয়ার আগে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে নতুন দেশ যুক্ত হলেও নারী কর্মীদের ঝুঁকি কমবে না।

নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বদলে দিচ্ছে নারীদের সিদ্ধান্ত
ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে বিদেশফেরত নারী কর্মীদের নিয়ে কাজ করে ওকাপ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, গৃহকর্মের বাইরে নারীদের জন্য তেমন নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়নি।

একই সঙ্গে বিদেশে গিয়ে নারীদের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এখন অন্যদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করছে। ফলে আগে যেসব পরিবার থেকে নারী কর্মীরা বিদেশে যেতেন, তাদের অনেকে এখন আর যেতে আগ্রহী নন। সেখানে পুরুষ কর্মীদের বিদেশযাত্রা বাড়ছে।

ওকাপের গত বছরের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশ নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। আর ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।

অন্য দেশগুলো কীভাবে এগিয়ে?
ব্র্যাকের ৪২টি দেশে কাজের অভিজ্ঞতা বলছে, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের নারী কর্মীদের সুরক্ষায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছে।

প্রয়োজনে এসব দেশ শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্তও নিয়েছে।

বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি। ফলে নতুন বাজার তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

সামনে কী সুযোগ?
বাংলাদেশের নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রা কমে যাওয়ার পর চলতি বছরে আবার কিছুটা বাড়ছে। একই সময়ে সরকার সৌদি আরব ও জর্ডানের বাইরে জাপান ও হংকংয়ের মতো বাজারে নজর দেওয়ার কথা বলছে।

এটি নারী কর্মসংস্থানে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু নতুন দেশে কর্মী পাঠালেই হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, সঠিক নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

ওকাপের চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলামের ভাষায়, নির্যাতনের শিকার হয়ে নারীরা দেশে ফিরছেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বিচার পাচ্ছেন না। এসব ঘটনা অন্যদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ভালো শ্রমবাজার তৈরি না হওয়া এবং কাজের বৈচিত্র্য না থাকাও নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রায় অনাগ্রহের কারণ হয়ে উঠেছে।

ফলে সৌদি-জর্ডাননির্ভরতা কাটিয়ে নতুন বাজার তৈরি এখন শুধু কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশি নারী কর্মীদের জন্য নিরাপদ, দক্ষতা-ভিত্তিক ও বৈচিত্র্যময় বিদেশি কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরির পরীক্ষাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *