জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরও একাধিক অভিযোগ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে পৃথকভাবে আসা বিষয়গুলো আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্ত করা হবে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ।
তিনি জানান, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে অনুসন্ধান চলছে। নতুন করে আসা অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে কমিশন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলোও আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে সমন্বয় করে দেখা হবে।
অর্থ পাচারের অভিযোগ কতটা গুরুতর?
দুদকে জমা পড়া নতুন অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে পাঁচটি দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যক্তি ও স্বজনের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও বিনিয়োগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রীন গ্রুপ’-এ মূলধন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি পর্তুগালে দুর্নীতির অর্থ দিয়ে জমি কেনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে পাঁচ দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদক সূত্র বলছে, এসব অভিযোগের পাশাপাশি নিয়োগ-পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় থাকবে।
নিয়োগ-পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ এবং ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। দুদকের অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে।
স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে তার বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন এবং পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ লেনদেনের তদবির এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের অভিযোগও রয়েছে।
আগের অনুসন্ধানও চলছে
এর আগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
গত ২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ওই অনুসন্ধানে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে বিশেষ টিম গঠন করা হয়। অন্য তিনজন হলেন—তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।
পরদিন এ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে চার ধরনের নথি চাওয়া হয়। এর মধ্যে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে সম্পন্ন হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির নথিপত্র এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকের ভিত্তিতে বদলি-সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার আসিফ মাহমুদের
দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন আসিফ মাহমুদ। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।
এর আগে, গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, দুদকের অনুসন্ধান দুর্নীতি খুঁজে বের করার প্রকৃত প্রক্রিয়া নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে তাকে হয়রানি ও ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তার দাবি, তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং বিষয়টি ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ রূপ দেওয়া হচ্ছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে তার মানহানি হয়েছে দাবি করে গত ১০ সেপ্টেম্বর বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য আইনি নোটিশও দেন আসিফ মাহমুদ।
এর আগে, ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ীই আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে।
নতুন অভিযোগগুলো আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এখন অর্থ পাচার, নিয়োগ-পদায়ন, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং কথিত কমিশন বাণিজ্যসহ অভিযোগের বিস্তৃত পরিসর একসঙ্গে খতিয়ে দেখবে দুদক।








