ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে। চক্রটি প্রথমে ভুক্তভোগীদের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠাত। পরে নেপাল বা শ্রীলঙ্কা হয়ে মিসর ও লিবিয়ায় নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে নৌপথে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করা হতো।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের মাধ্যমে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার হয়েছেন। রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে চক্রটির অন্যতম মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য পেয়েছে এসআরবি-৪।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৪-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান।
এর আগে, সোমবার রাতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বনানীর সি ব্লক এলাকা থেকে আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১২ বছর ধরে বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগ
এসআরবি জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আরজু রহমান প্রায় ১২ বছর ধরে অবৈধভাবে লোকজনকে বিদেশে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে তিনি এ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভালো বেতনের চাকরির সুযোগ দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। জনপ্রতি সাধারণত ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ অর্থ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাত।
এ ছাড়া সার্বিয়া ও বেলারুশ হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে কয়েকজনের কাছ থেকে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নেপাল-শ্রীলঙ্কা হয়ে মিসর ও লিবিয়া
এসআরবি-৪-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, চক্রটির কৌশল ছিল ধাপে ধাপে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন দেশে স্থানান্তর করা। প্রথমে তাদের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। পরে নেপাল বা শ্রীলঙ্কা হয়ে মিসর ও লিবিয়ায় নেওয়া হতো।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হতো। এভাবে কয়েকজন ভুক্তভোগী বিদেশে গিয়ে আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
৩০ থেকে ৩৫ ভুক্তভোগীর যোগাযোগ
আরজু রহমান গ্রেপ্তারের পর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। পাশাপাশি আরও প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগীর সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে চক্রটির মাধ্যমে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করছে এসআরবি।
জাল কাগজপত্রে নারী পাচারের অভিযোগ
শুধু পুরুষ নয়, ভুয়া ভিসা ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে নারীদেরও বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে নেওয়ার পর কয়েকজন নারী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। মিসর থেকে কয়েকজন নারী পালিয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করেছেন। তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এখনো কয়েকজন নারী মিসরে আটকা রয়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
গ্রেপ্তার আরজু রহমানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।








