বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফিরেছে ৪ হাজার ৬০ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। অর্থাৎ বছরের প্রথম ২৭৩ দিনে প্রতিদিন গড়ে ১৪টির বেশি মরদেহ দেশে এসেছে।
মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে সৌদি আরব। চলতি বছর দেশটিতে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর রয়েছে মালয়েশিয়া। অথচ দেশটিতে গত আড়াই বছর ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ রয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন
বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনায় বড় একটি অংশের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে আসা মরদেহগুলোর ৬৬ শতাংশের কাগজপত্রে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৩৪ শতাংশ মারা গেছেন দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে।
তবে অভিবাসন খাতের গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, বিদেশে কর্মরত তরুণ শ্রমিকদের এত বেশি মৃত্যু আসলে কতটা স্বাভাবিক?
তাদের মতে, কর্মীর মৃত্যুর কারণ যে দেশে ঘটেছে, সাধারণত সেখানকার কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই বাংলাদেশে নথিভুক্ত হয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, আত্মহত্যায় বাধ্য করা, হত্যাকাণ্ড কিংবা কাজের পরিবেশজনিত অসুস্থতার মতো অভিযোগগুলো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে যাচাই করা হয় না।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনাই মোট মৃত্যুর ১৬ শতাংশের বেশি।
এর আগে, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড দেখেছিল, ওই সময়ে ১৮ হাজার ১৬৬ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৮ জন সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলের দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ও বৈদ্যুতিক শকে মারা যান। শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয় ২ হাজার ৬৪৯ জনের।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, কর্মস্থলে যাতায়াত এবং কাজ করার সময় বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণেই বড় অংশের মৃত্যু হচ্ছে।
সৌদিতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। চলতি বছরও সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন দেশটিতে। স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর সংখ্যাতেও দেশটি শীর্ষে।
চলতি বছর সৌদি আরবে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর সবচেয়ে বেশি মরদেহ এসেছে মালয়েশিয়া থেকে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসানের মতে, বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর ৭০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং এর মধ্যে সৌদি আরবের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, প্রতিবছর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ কর্মীরাও মারা যাচ্ছেন। তাই প্রতিটি মৃত্যুর কারণ আলাদাভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
প্রচণ্ড তাপও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় একটি অংশ নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে কাজ করেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দিনের দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে তারা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন বলে মনে করছেন অভিবাসন খাতের গবেষকেরা।
তীব্র তাপ ও দীর্ঘ সময় সূর্যের নিচে কাজের কারণে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। এতে কিডনি, হৃদ্যন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র ও মস্তিষ্কসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের মতো বিদ্যমান সমস্যাও অতিরিক্ত তাপে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। ফলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণগুলো নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা গেলে কর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
মরদেহ ফেরাতেও ভোগান্তি
বিদেশে কর্মীর মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের। তবে সব ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি সহজ নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মরদেহ ফেরাতে একাধিক সরকারি দপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। আবার যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশ থেকে মরদেহ আনতে আরও বেশি সময় লাগে।
এরই একটি উদাহরণ পাবনার আল আমিন। কম্বোডিয়ার একটি টাইলস কারখানায় কাজ করার সময় শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। তার মৃত্যু হয় ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল। কিন্তু মরদেহ দেশে আসে চলতি বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর, প্রায় দেড় বছর পর।
আল আমিনের শ্যালক মাসুম খান জানান, কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করতেও জটিলতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে তিনি কল্যাণ বোর্ডকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো কর্মী বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বিদেশে গেলে সাধারণত মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হয়। কিন্তু কর্মী অনিয়মিত হয়ে গেলে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হয়।
করোনার পর আবার বাড়ছে মরদেহের সংখ্যা
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে আসে। ২০২০ সালে করোনার কারণে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪০ জনে।
সে সময় অনেক মরদেহ দেশে না এনে গন্তব্য দেশেই দাফন করা হয়েছিল। করোনার প্রভাব কমার পর ২০২১ সাল থেকে দেশে ফেরত আসা মরদেহের সংখ্যা আবার বাড়তে থাকে।
সাধারণ সময়ে বিদেশে মারা যাওয়া কর্মীদের ১ শতাংশেরও কম গন্তব্য দেশগুলোতে দাফন করা হয়। অধিকাংশ পরিবারই তাদের স্বজনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়।
পরিবার পাচ্ছে আর্থিক সহায়তা
বিদেশে মারা যাওয়া কর্মীর মরদেহ দেশে আনার পাশাপাশি তাঁর পরিবারকে আর্থিক সহায়তাও দেয় সরকার। দেশে আসা প্রতিটি মরদেহ দাফনের জন্য কল্যাণ বোর্ড থেকে ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এরপর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি জীবনবিমার সুবিধাও রয়েছে।
বিদেশে মৃত কর্মীর কোনো ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া পাওনা থাকলে দূতাবাসের মাধ্যমে তা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মৃত কর্মীদের মরদেহ দাফনে ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আর্থিক অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বিমাসুবিধা হিসেবে পরিবারগুলো পেয়েছে ৪৪ কোটি টাকার বেশি। বিদেশ থেকে ক্ষতিপূরণ, বকেয়া ও বিমার অর্থ আদায় করে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।
তবে এসব সুবিধা পেতে ভোগান্তির অভিযোগও রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, অনেক পরিবারকে সহায়তার জন্য দিনের পর দিন কল্যাণ বোর্ডে ঘুরতে হয়। বিশেষ করে অনিয়মিত কর্মীদের পরিবার অনেক সময় সরকারি সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়ে।
বৈধ-অবৈধের হিসাবের বাইরে মরদেহ ফেরানোর দাবি
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশ যাওয়ার আগে বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়া কর্মী অথবা বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশি দূতাবাসে সদস্য হিসেবে নিবন্ধিত কর্মীর মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যয় বোর্ড বহন করে।
তবে এসবের কোনোটি না থাকলেও পরিবার আবেদন করতে পারে। তখন বিষয়টি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থেকে মরদেহ দেশে আনার ব্যয় বহন করা হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন কর্মী বিদেশে বৈধ না অবৈধ অবস্থায় ছিলেন, এটি তার মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে বাধা হওয়া উচিত নয়।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, অনিয়মিত কর্মী হলেও তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত। মরদেহ ফেরাতে কোনোভাবেই দীর্ঘসূত্রতা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিন দিনের প্রশিক্ষণে বড় শ্রমবাজারের প্রস্তুতি কতটা?
বিদেশে যাওয়ার আগে বিএমইটির মাধ্যমে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। গন্তব্য দেশের নিয়মকানুন, আচার-আচরণ ও নিরাপত্তা সম্পর্কে তাদের ধারণা দেওয়ার কথা।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই বলছেন, এই প্রশিক্ষণ মাত্র তিন দিনের। এত অল্প সময়ে একজন কর্মী যে দেশে যাচ্ছেন, সেই দেশের কাজের ধরন, পরিবেশ, কর্মঘণ্টা, শারীরিক চাপ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব নয়।
অভিবাসন খাতের গবেষকেরা বলছেন, প্রশিক্ষণে শুধু নিয়মকানুন জানালেই হবে না। যে দেশে কর্মী যাচ্ছেন, সেখানে কী ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারেন এবং কীভাবে নিজের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, সেটিও হাতে-কলমে শেখানো দরকার।
প্রতিটি মৃত্যুর তদন্ত চান সংশ্লিষ্টরা
প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি বলে মনে করছেন অভিবাসন খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
তাদের মতে, মৃত্যুকে শুধু ‘স্বাভাবিক’ বা ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে নথিভুক্ত না করে ঘটনার পেছনের কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। এতে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ঘাটতি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, তাপজনিত অসুস্থতা, নির্যাতন কিংবা মানসিক চাপের মতো বিষয় সামনে আসতে পারে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ১ অক্টোবর বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে এবং মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ ফেরানোর বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিদেশে কর্মীদের মৃত্যুর কারণ যাচাইয়ের জন্য কী করা যায়, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিদেশে কর্মীদের মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে হলে প্রথমেই জানতে হবে তারা কেন মারা যাচ্ছেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ শনাক্ত না করে শুধু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা বা পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সূত্র: প্রথম আলো








