হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার কিছু সমস্যার সমাধান হলেও পুরোপুরি কাটেনি ভোগান্তি। বিশেষ করে লাগেজ পেতে বিলম্ব, ট্রলির স্বল্পতা এবং ইমিগ্রেশনে হয়রানির অভিযোগ এখনো করছেন অনেক যাত্রী। এর মধ্যেই পুরোনো ছবি ও ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে বিমানবন্দরের প্রকৃত সমস্যা ও অপপ্রচারের তথ্য এখন আলোচনায়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরের ট্রলি সংকটের বেশ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যাচাই করে এসব ভিডিওর কিছু ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। সরেজমিনেও বিমানবন্দরের এপ্রোন এলাকায় ট্রলি সংকটের চিত্র দেখা গেছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দাবি, শাহজালালে প্রায় ৪ হাজার ট্রলি রয়েছে। তবে একসঙ্গে কয়েকটি বড় ফ্লাইট অবতরণ করলে যাত্রীদের তুলনায় ট্রলির সংখ্যা কম পড়ে যায়। তখন সাময়িকভাবে সংকট তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েক মাস আগে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকেও ট্রলি এনে শাহজালালে ব্যবহার করা হয়েছিল।
মদিনার ফ্লাইট ঘিরে উত্তেজনা
গত ১ অক্টোবর মদিনা থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের যাত্রীদের লাগেজ পেতে দেরি এবং ট্রলি না পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরের বেল্ট এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
ইমিগ্রেশন শেষ করে আট নম্বর লাগেজ বেল্টে গিয়ে লাগেজ সংগ্রহের অপেক্ষায় ছিলেন যাত্রীরা। ওই সময় আগমনী যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় ট্রলি সংগ্রহে সাময়িক সংকট দেখা দেয় এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। লাগেজ পেতে দেরির পাশাপাশি জমজমের পানি না পাওয়ার বিষয়টিও উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ঘটনাস্থলে গেলে জামায়াতের সহযোগী সদস্য ও সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিমানবন্দর পরিচালককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ সময় প্রটোকল সহকারীদের ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও রয়েছে।
পরে বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, কর্মকর্তাকে হুমকি এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এক দিনের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে বিমানবন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করতে দেখা যায়।
যাত্রীদের অভিযোগও কম নয়
বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নয়, সাধারণ যাত্রীদেরও অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে গণমাধ্যমকর্মী আবুল কালাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশে ফেরার পর লাগেজ পেতে তার প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। তার দুটি লাগেজের একটির মুখ খোলা এবং অন্যটি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়।
এর আগে, সৌদি আরব থেকে দেশে আসা যাত্রী মফিজুল আলমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা জানান। তার অভিযোগ, দীর্ঘ যাত্রা শেষে ঢাকায় নেমে লাগেজের জন্য প্রায় ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। লাগেজ পাওয়ার পর শুরু হয় ট্রলি নিয়ে টানাটানি। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তিনি একটি ট্রলি পান।
এসব পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
আখতারুজ্জামানের অভিযোগও লিখিত
মদিনা থেকে আসা ওই ফ্লাইটে আখতারুজ্জামানের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন প্রতিনিধি ও অন্যান্য যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে জামায়াতের চারজন এমপিও ছিলেন।
লাগেজ ও ট্রলি নিয়ে সমস্যার পর আখতারুজ্জামান বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে বিমানবন্দরের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা নিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। একই ফ্লাইটে থাকা জামায়াতের চার এমপিও এসব বিষয়ে অভিযোগ করেছেন।
ঘটনার সময় জামায়াতের দলীয় সংরক্ষিত নারী এমপি মাহফুজা হান্নানের মেয়ে, সিলেটের চিকিৎসক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডা. ওরাকাতুল জান্নাত ফেসবুকে লাইভ করেন। পরে সেই ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তার বাবা জামায়াতের নেতা এবং সিলেটে দলটির এমপি প্রার্থী ছিলেন।
সত্যিকারের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পুরোনো ভিডিও
বিমানবন্দরে ভোগান্তির বাস্তব অভিযোগের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো ছবি ও ভিডিও নতুন ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী অতীতে বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া যাত্রী ভোগান্তির ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছেন। এসব ভিডিওর কিছু যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলো সাম্প্রতিক সময়ের নয়। পুরোনো ঘটনার ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ায় বিমানবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতও বিমানবন্দর নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেছেন। তার ভাষ্য, যাত্রী হয়রানির নামে পুরোনো ভিডিও ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। অন্যদিকে দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে সংশ্লিষ্টদের পুরস্কৃত করা হবে।
সক্ষমতার ঘাটতিতেই কি মূল সমস্যা?
বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত সক্ষমতা দিয়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে সেবা দিতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় কিছু সরঞ্জাম কম থাকায় সেবায় বিঘ্ন ঘটে।
তাদের মতে, স্বাভাবিক সময়ে শাহজালালে ট্রলি নিয়ে বড় ধরনের সংকট দেখা যায় না। কিন্তু একসঙ্গে কয়েকটি বড় ফ্লাইট অবতরণ করলে হঠাৎ করে যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যায়। তখনই ট্রলির চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে শুধু সরঞ্জামের ঘাটতিই নয়, কিছু কর্মকর্তার আচরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কোনো কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি জটিল করে তোলেন এবং সহজ বিষয়েও যাত্রীদের হয়রানি করেন। ইমিগ্রেশনেও ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যাত্রীদের হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে।
ভোগান্তি কমাতে দরকার বাস্তব সমাধান
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের যাত্রীসেবায় একদিকে যেমন বাস্তব কিছু সমস্যা রয়েছে, অন্যদিকে সেসব সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভুল বা পুরোনো তথ্য ছড়ানোর প্রবণতাও তৈরি হয়েছে।
লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, পর্যাপ্ত ট্রলি না পাওয়া কিংবা ইমিগ্রেশনে অপ্রয়োজনীয় হয়রানির মতো অভিযোগগুলোকে শুধু অপপ্রচার বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে পুরোনো ঘটনার ছবি বা ভিডিওকে নতুন ঘটনা হিসেবে প্রচার করাও যাত্রীদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি করে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বিমানবন্দরের সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃত ভোগান্তি কমবে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যেকোনো ছবি বা ভিডিও নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে এর সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই করাও জরুরি।








