মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে ধাপে ধাপে টাকা আদায়, শেষে লিবিয়ায় বন্দী

ইতালিতে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক যুবকের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা আদায়ের পর তাকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাঠিয়ে শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে একটি মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে। সেখানে কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি পরিবারের কাছে মুক্তিপণও দাবি করা হয়।

এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মো. আতিকুর রহমান টমাস (৩২) ও মো. বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলাল (৫৪)।

সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আশকোনা হাজি ক্যাম্পের সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার মার্কেটের সামনে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। সিআইডির মিডিয়া বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে।

সৌদি থেকে ফেরার পথে ‘ইতালির’ প্রস্তাব
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, নোয়াখালীর সেনবাগের ওই যুবক প্রায় তিন বছর সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। দেশে ফেরার সময় বিমানে এক যাত্রীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তির মাধ্যমেই পরে মানবপাচার চক্রের একজনের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়।

চক্রের সদস্যরা তাকে লিবিয়া হয়ে নিরাপদে ইতালি পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। এ জন্য চুক্তি হয় ১২ লাখ টাকায়।

প্রস্তাবে রাজি হয়ে গত ৫ এপ্রিল ঢাকার আশকোনার একটি অফিসে নিজের পাসপোর্ট জমা দেন ওই যুবক। একই সঙ্গে অগ্রিম হিসেবে দেন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

এর দুই দিন পর, ৭ এপ্রিল তাকে ভারতের নয়াদিল্লিতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো। প্রায় ১৬ দিন কলম্বোয় রাখার পর বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা নেওয়া হয়।

একের পর এক দেশে পাঠানো হয়
কলম্বোর পর তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ হয়ে মিশরের কায়রোতে পাঠানো হয়। কায়রো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর চক্রের একজন সদস্য তাকে একটি বাসায় নিয়ে যান বলে অভিযোগ।

সেখানে প্রায় পাঁচ দিন তাকে আটকে রাখা হয়। এরপর আগের চুক্তির কথা উল্লেখ করে তার কাছে আরও ৬ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করা হয়।

সিআইডি বলছে, নগদ টাকা, বিকাশ ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের কাছ থেকে সব মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

মরুভূমি পেরিয়ে লিবিয়ায়
টাকা নেওয়ার পরও ইতালির যাত্রা শুরু হয়নি। বরং গাড়িতে করে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত পার করে ওই যুবককে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়।

সেখানে চক্রের সহযোগী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি তাকে একটি কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রাখে বলে অভিযোগ। ওই স্থানে তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে অন্যদের সঙ্গে তাকেও আটক করে। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাগারে যাওয়ার পরও পরিবারের কাছে অর্থ চাওয়ার ঘটনা থামেনি। তাকে ছাড়িয়ে আনার কথা বলে পরিবারের কাছে আরও ৬ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে জানিয়েছে সিআইডি।

শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরত
লিবিয়া পুলিশের হাতে আটক থাকার পর ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর ওই যুবককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফিরে তিনি নিজেই বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্তে নেয় সিআইডি।

তদন্তকারীরা জানান, মামলার নথি, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আতিকুর রহমান টমাস ও বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলালের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

পরে আশকোনা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে
গ্রেফতার দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচার চক্রের অন্য সদস্য, বিদেশে থাকা সহযোগী এবং অর্থ লেনদেনের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

সিআইডি জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *