বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনে আসছে ‘প্রবাসী তথ্য ফরম’

বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের জটিলতা কমাতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রবাসীদের জন্য আলাদা করে ‘প্রবাসী তথ্য ফরম’ চালুর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। প্রাথমিকভাবে এই ফরমের মাধ্যমে প্রবাসীদের পরিচয়, বিদেশে অবস্থান এবং পারিবারিক তথ্য যাচাই করে সংশোধনের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির পথ তৈরি করতে চায় ইসি।

ইসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের বিষয়টি সাধারণ আবেদনের চেয়ে কিছুটা আলাদা। বিশেষ করে বয়স সংশোধনের আবেদনে অনেক সময় পুরোনো ভোটার তথ্যের সঙ্গে বর্তমান দাবির অসঙ্গতি দেখা যায়। ফলে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেই কীভাবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া যায়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

বয়স সংশোধনেই বেশি জটিলতা
ইসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের আবেদনে বয়স পরিবর্তনের বিষয়টি বেশি দেখা যায়। কিন্তু এসব আবেদন যাচাই করতে গিয়ে অনেক সময় পুরোনো ভোটার তথ্যের সঙ্গে বর্তমান দাবির বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া যায়।

২০০৮ সালে দেশে প্রথমবার ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই তালিকার ভিত্তিতেই নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়।

এখন কেউ যদি দাবি করেন, ২০০৮ সালে ভোটার হওয়ার সময় তার বয়স ১৮ বছর দেখানো হলেও প্রকৃত বয়স ছিল ১০ বছর, তাহলে সেই তথ্য যাচাই করা ইসির জন্য জটিল হয়ে পড়ে। কারণ ভোটার হওয়ার সময়কার তথ্যের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে দেওয়া দাবির সামঞ্জস্য পরীক্ষা করতে হয়।

এই ধরনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রবাসীদের জন্য আলাদা তথ্যভিত্তিক ফরম চালুর চিন্তা করছে ইসি।

‘প্রবাসী তথ্য ফরমে’ থাকবে যেসব তথ্য
প্রস্তাবিত ফরমটি দুটি অংশে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম অংশে প্রবাসীর ব্যক্তিগত ও বিদেশে অবস্থানের তথ্য নেওয়া হবে।

এ অংশে থাকতে পারে,

নাম

যে দেশে বসবাস করছেন

কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন কি না

জন্মতারিখ

পাসপোর্ট নম্বর

বিদেশের ঠিকানা

ফরমের দ্বিতীয় অংশে প্রবাসীর পারিবারিক তথ্য রাখা হবে। সেখানে পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানের তথ্য দিতে হবে।

এর সঙ্গে ভিসার কপি, পাসপোর্ট এবং প্রবাসী হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথিও জমা দিতে হবে।

ইসি মনে করছে, এসব তথ্য ও নথি একসঙ্গে পাওয়া গেলে আবেদনকারী সত্যিই প্রবাসী কি না এবং তার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে পারিবারিক ও অন্যান্য নথির সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করা সহজ হবে। এর ফলে সংশোধনের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এখনো চূড়ান্ত হয়নি সিদ্ধান্ত
প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনে শিথিলতা আনার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, এনআইডি সাধারণ কোনো কার্ডের মতো নয়। তাই সংশোধনের ক্ষেত্রে আইন ও বিধি অনুসরণ করেই বাস্তবভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে।

তিনি জানান, প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে একটি কর্মশালাও আয়োজন করা হবে।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, ‘প্রবাসী তথ্য ফরম’ চালুর বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

১৯ দেশে চলছে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন
বর্তমানে বিশ্বের ১৯টি দেশে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন সেবা দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। দেশগুলো হলো—সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালদ্বীপ, ওমান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড।

প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের আবেদনও নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী ছয়টি ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তি করা হয়। এগুলো হলো, ক, ক-১, খ, খ-১, গ ও ঘ।

কোন ক্যাটাগরির আবেদন কে নিষ্পত্তি করেন
ক-১ ক্যাটাগরিতে করণিক ভুল ও স্বাক্ষর পরিবর্তনের মতো সংশোধনের আবেদন রাখা হয়। এসব আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার।

মূল নাম অপরিবর্তিত রেখে শুধু বানান সংশোধনের আবেদন ক ক্যাটাগরিতে পড়ে। এ ধরনের আবেদন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নিষ্পত্তি করেন। একই পর্যায়ে ছবি পরিবর্তন, আঙুলের ছাপ হালনাগাদ এবং জেএসসি, এসএসসি ও অনলাইন শিক্ষা সনদ অনুযায়ী বয়স সংশোধনের আবেদনও নিষ্পত্তি করা হয়।

বানান পরিবর্তনের কারণে নামের পরিবর্তন হলে সেটি খ ক্যাটাগরির আবেদন হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।

পুরো নাম পরিবর্তনের আবেদন গ ক্যাটাগরিতে রাখা হয় এবং এর নিষ্পত্তির দায়িত্ব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার।

অন্যদিকে ধর্ম পরিবর্তনের কারণে নাম বা শিক্ষাগত যোগ্যতায় পরিবর্তনের আবেদন খ-১ ক্যাটাগরির। এসব আবেদন অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নিষ্পত্তি করেন।

খ ও খ-১ ক্যাটাগরিতে বাতিল হওয়া আবেদন নিষ্পত্তির দায়িত্ব অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার। আর সবচেয়ে জটিল আবেদনগুলো রাখা হয় ঘ ক্যাটাগরিতে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা শুধু এনআইডি মহাপরিচালকের।

১ লাখ ৩৫ হাজারের মতো আবেদন পেন্ডিং
ইসি সূত্রের হিসাবে, বর্তমানে সব ক্যাটাগরি মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন ঘ ক্যাটাগরিতে-৮২ হাজার ৭৫৬টি।

এই আবেদনগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালের ৭ হাজার ৬০টি এবং ২০২৬ সালের ৭৫ হাজার ৬৯৬টি আবেদন রয়েছে।

আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (পরিচালনা) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, পেন্ডিং আবেদনগুলো নিষ্পত্তিতে কাজ চলছে। ২০২৫ সালের আবেদনগুলোর নিষ্পত্তির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরপর ২০২৬ সালের ঘ ক্যাটাগরির আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ অবস্থায় প্রবাসীদের জন্য আলাদা তথ্য ফরম চালু হলে তাদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও গোছানো হতে পারে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। তবে উদ্যোগটি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে থাকায় এর চূড়ান্ত কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি পরে নির্ধারণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *