সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দাগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো যাত্রী। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাতটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সৌদি আরবগামী ২ হাজার ৫৩২ জনের যাত্রা আটকে গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিমানবন্দরে এসে কেউ পড়েছেন বাড়তি যাতায়াত খরচের চাপে, কেউ আবার নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় চাকরি ও চুক্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলার পর সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে ঢাকার বিমানবন্দরেও। ফ্লাইট বাতিলের কারণে যাত্রীরা যেমন সৌদি আরবে যেতে পারছেন না, তেমনি সেখান থেকে দেশে ফেরার পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কবে আবার বিমান চলাচল স্বাভাবিক হবে, টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করতে হবে কি না এবং নতুন করে যাতায়াতের খরচ কে বহন করবে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ভুক্তভোগীরা।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, বাতিল হওয়া সাতটি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট রয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ জানান, বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোতে ২ হাজার ৫৩২ জন যাত্রীর রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাচ্ছে। পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হতে যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দরে এসে ফিরতে হচ্ছে যাত্রীদের
ফ্লাইট বাতিলের সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা। অনেকেই বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে ফ্লাইট বাতিলের খবর পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। বিমানবন্দরে পৌঁছে যাত্রা স্থগিতের বিষয়টি জানতে পেরে তাদের ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এতে বাড়তি যাতায়াত ব্যয়ের পাশাপাশি থাকা-খাওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বরিশাল থেকে আসা এক যাত্রীর অভিযোগ, ফ্লাইট বাতিলের বিষয়ে তাদের আগেভাগে জানানো হয়নি। বিকল্প ব্যবস্থা বা পরবর্তী ফ্লাইটের সময় সম্পর্কেও স্পষ্ট নির্দেশনা পাননি তারা। বিমানবন্দরে পোস্টার টাঙিয়ে ফ্লাইট বন্ধের তথ্য জানানো হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, ফ্লাইট চালু হলে টিকিট কার্যকর করার বিষয়ে পোস্টারে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে।
ওই যাত্রী বলেন, কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য তার কন্ট্রাক্টর জরুরি ভিত্তিতে ফোন করছেন। কিন্তু ফ্লাইট কবে চালু হবে, তা না জানায় তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। আবার দেশে ফিরলে ছুটি নতুন করে মঞ্জুর করানোর প্রয়োজন হতে পারে। বরিশাল থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়ার খরচও তার জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
নোয়াখালী থেকে আসা আরেক যাত্রী জানান, ঢাকায় আসতেই তাদের অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন আবার বাড়ি ফিরে যেতে হলে যাতায়াতে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা ব্যয় হবে। এই বাড়তি খরচ কে বহন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
ওই যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে তাকে কারওয়ান বাজারের সোনারগাঁও হোটেলে অবস্থিত বিমানের অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ফ্লাইট চালু হলে যোগাযোগ করে টিকিটের ব্যবস্থা করতে হবে এবং নতুন টিকিটের জন্য টাকা লাগবে না বলেও তাকে জানানো হয়েছে। তবে ফ্লাইট পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময় তিনি জানতে পারেননি।
কর্মস্থলে ফিরতে না পারার দুশ্চিন্তা
সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের অনেকের জন্য নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো জরুরি। ফ্লাইট বাতিলের কারণে দীর্ঘ সময় দেশে আটকে থাকতে হলে চাকরি, ছুটি ও কর্মচুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন যাত্রীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন করে টিকিটের তারিখ নির্ধারণ, কর্মস্থলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অতিরিক্ত থাকা-খাওয়ার ব্যয়।
বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদগামী যাত্রী আকবর হোসেন জানান, তার নির্ধারিত ফ্লাইট ছিল সেদিনই। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে যেতে না পারায় এখন কী করবেন, তা বুঝতে পারছেন না।
আকবর হোসেন বলেন, সময়মতো সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে তার সমস্যা হবে। দ্রুত পরিস্থিতির সমাধান না হলে তাদের মতো যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শরীফ উদ্দিনও একই ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের টিকিট কেটে মুম্বাই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তার যাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফ্লাইট চালুর অপেক্ষায় এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের অবহিত করছে। তবে পরবর্তী ফ্লাইটের সময়সূচি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মধ্যরাতে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও মিসর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন। হামলার পর বিমানবন্দরটির সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
ফলে সৌদি আরবগামী যাত্রীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কখন আবার ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে এবং আটকে পড়া যাত্রীদের যাত্রা কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে। আপাতত সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে তাদের।








