সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৪ বাংলাদেশি, যাদের মধ্যে ১১ জন কর্মী ও ১৩ জন ওমরাহ যাত্রী। হামলার সময় তারা রিয়াদ থেকে জেদ্দাগামী যাত্রার জন্য বিমানবন্দরে ট্রানজিটে অপেক্ষা করছিলেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া তথ্য থেকে হতাহতের পাশাপাশি হামলার পর সৌদি আরবে আটকে পড়া বাংলাদেশি যাত্রীদের দুর্ভোগ ও তাদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এর ওপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে বিভিন্ন দেশের যাত্রীরা হতাহত হন। প্রাথমিক হিসাবে, হামলায় মোট ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি রয়েছেন।
চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের অবস্থা
আহতদের চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থার খোঁজ রাখতে রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতালে গিয়ে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন তিন বাংলাদেশির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। তাদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছে।
তারা হলেন ঢাকার হাফেজ হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজী নুরুল্লাহ এবং সৌদি আরবে কর্মরত মো. ওমর ফারুক।
ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন নওগাঁর সাফকাত রহমান ও কুমিল্লার মো. দাউদুল ইসলাম। তাদের মধ্যে সাফকাত রহমান অচেতন অবস্থায় আছেন বলে দূতাবাস জানিয়েছে।
রিয়াদ মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ঢাকার মো. সাইমুল ইসলাম সৌরভ ও আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীন। প্রিন্স সুলতান মিলিটারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ঢাকার মো. আব্দুল্লাহ।
এ ছাড়া সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের তাখাসসুসি শাখায় আরমান হোসেনসহ তিন বাংলাদেশি কর্মী চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিংডম হাসপাতালে রয়েছেন মো. রফিক মিয়া। কিং খালেদ মেডিক্যাল সিটিতে চিকিৎসাধীন ইসমাইল হোসাইন, মো. মিসবাহ উদ্দিন হীরক ও মো. রায়হানুল ইসলাম।
প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাঁচ বাংলাদেশি কর্মী হলেন সালমা আক্তার, মো. শাহাদাত হোসেন, মোশাহিদ আহমেদ সৈকত, জাহিদ আহমেদ এবং সোহবে সাদেক মো. শাহজাহান সরকার।
এজতাহ সনদ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন মো. আসাদুল ইসলাম ও মো. জামাল। সুলাইমান ফকিহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাজমা আক্তার। অন্যদিকে, সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের আলসাহাফা শাখায় চিকিৎসা নিচ্ছেন উমায়ের ও আব্দুল্লাহ কামিল।
দূতাবাস জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশিরা সবাই রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে ট্রানজিটের অপেক্ষায় ছিলেন।
হামলার পর বিমানবন্দরে আটকে পড়েন প্রায় ৫০০ যাত্রী
হামলার প্রভাব শুধু হতাহতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে আসা এবং রিয়াদ হয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রায় ৫০০ যাত্রী আটকে পড়েন। রিয়াদ থেকে বাংলাদেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরাও এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন।
আটকে পড়া যাত্রীদের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে আবাসন, খাবার ও বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।
টার্মিনাল-৩-এ সৌদিয়া এয়ারলাইনসের এসভি৮০৪, রিয়াদ এয়ারের আরএক্স১৭ এবং ইউএস-বাংলার ইউএস২৮১ ফ্লাইটে বাংলাদেশ থেকে আসা যাত্রীদের পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রায় ১০০ জনের জন্য আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ফ্লাইনাস, ফ্লাইএডিল ও ফ্লাইরিয়াদের যাত্রীদেরও এ ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়েছে।
যাত্রীদের মেরিয়ট হোটেল, রেডিসন হোটেল এবং প্রিন্সেস নূরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে রাখা হয়েছে।
ইহরাম পরা ৬৭ ওমরাহ যাত্রীর জন্য বিশেষ পরিবহন
হামলার সময় বাংলাদেশ থেকে পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যাওয়া ৬৭ জন যাত্রী ইহরামের পোশাক পরা অবস্থায় ছিলেন। তাদের গন্তব্য ছিল জেদ্দা। পরিস্থিতির কারণে তাদের যাত্রা ব্যাহত হলে দূতাবাসের উদ্যোগে বিশেষ বাসে রিয়াদ থেকে জেদ্দায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে আটকে পড়া ওমরাহ যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়। তবে হামলার পর তাদের যাত্রা ও পরবর্তী কার্যক্রমে কী ধরনের বিলম্ব হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
বাতিল ফ্লাইটের যাত্রীদের পাঠানো হচ্ছে দাম্মাম হয়ে
রিয়াদ-ঢাকাগামী সৌদিয়া এয়ারলাইনসের এসভি-৮০৪ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি যাত্রীর দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাদের বাংলাদেশে পাঠাতে বিকল্প রুট ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় দূতাবাস।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, এসব যাত্রীকে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে রিয়াদ বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহারের পথ তৈরি হয়।
এ ছাড়া, রিয়াদ থেকে বাহরাইনগামী দুই বাংলাদেশি কর্মীকে আলখোবার স্থলবন্দর দিয়ে বাহরাইনে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমের পাশাপাশি জরুরি প্রশ্ন
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত যাত্রীদের নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা এবং বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। হামলার পর দূতাবাসের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের খোঁজ নেওয়া, আটকে পড়া যাত্রীদের আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা এবং বিকল্প পথে গন্তব্যে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে হামলার প্রকৃত লক্ষ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের উৎস এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, এসব বিষয়ে দূতাবাসের দেওয়া তথ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। একইভাবে, নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় এবং তাদের মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে কোনো তথ্যও ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
আহত ২৪ বাংলাদেশির চিকিৎসার অগ্রগতি, অচেতন অবস্থায় থাকা সাফকাত রহমানের শারীরিক পরিস্থিতি এবং আটকে পড়া সব যাত্রীর নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো, এখন সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হামলার কারণ ও দায় নির্ধারণে সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলও এ ঘটনার পূর্ণ চিত্র বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।








