মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

১৫ দিন আগেও ফোনে মুক্তির আশ্বাস, সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে দিশেহারা পরিবার

সৌদি আরবের কারাগার থেকে ১৫ দিন আগেও বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন টাঙ্গাইলের সুইটি আক্তার। জানিয়েছিলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই মুক্তি পেতে পারেন। কিন্তু এর মধ্যেই সৌদি কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে বলে খবর পেয়েছে পরিবার। তবে এ খবরের সত্যতা এখনো সরকারি কোনো সূত্রে নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। ফলে মেয়ের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে স্বজনদের।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেরা ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামে সুইটিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশীরা সেখানে ভিড় করছেন। সৌদি আরবে সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনদের খোঁজ নিতে আসছেন তারা। কিন্তু পরিবারের কাছে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য।

সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, তার মেয়ে কারাগারে থাকার কথা জানালেও বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কখনো কিছু বলেননি। বরং শেষ দিকের ফোনালাপে মুক্তির আশার কথাই জানিয়েছিলেন।

দেড় লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি পাঠানো
ফজল মিয়া পেশায় দিনমজুর। পাঁচ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট সুইটি। প্রায় চার বছর আগে ধারদেনা করে দেড় লাখ টাকা জোগাড় করে দালালের মাধ্যমে মেয়েকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল, মেয়ে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করবেন।

ফজল মিয়ার ভাষ্য, সৌদি যাওয়ার পর প্রথম পাঁচ মাস নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতেন সুইটি। এরপর একদিন ফোন করে জানান, তাকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে।

সুইটি পরিবারকে বলেছিলেন, সৌদি আরবে কর্মরত অন্য নারীকর্মীদের সঙ্গে ঝগড়ার পর তাকে ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে ওই ঘটনার বিস্তারিত, মামলার প্রকৃতি কিংবা অভিযোগের বিষয়ে পরিবারের কাছে কোনো নথি নেই।

ফজল মিয়া জানান, কারাগারে যাওয়ার খবর দেওয়ার পর প্রায় এক বছর মেয়ের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। পরে আবার ফোন আসে। এরপর প্রায় প্রতি মাসেই বাড়িতে কথা বলতেন সুইটি।

শেষ ফোনেও বলেননি মৃত্যুদণ্ডের কথা
পরিবারের দাবি, কারাগার থেকে নিয়মিত যোগাযোগ হলেও সুইটি কখনো তার বিচারের বিষয়ে কিছু জানাননি। শেষ দিকে ফোনে জানিয়েছিলেন, দুই মাস পর মুক্তি পেতে পারেন। সর্বশেষ ১৫ দিন আগেও পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার।

ফজল মিয়া বলেন, শেষ ফোনালাপেও মেয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানাননি। ফলে সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন।

তার কথায়, মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর তারা দুদিন আগে জানতে পারেন। তবে সৌদি আরবে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোনো পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি
সৌদি আরবে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সরকার জানতে পেরেছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি বলে জানা গেছে।

এই অবস্থায় সুইটির পরিবারের পাওয়া খবরের সঙ্গে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। পরিবারের কাছে এখনো এমন কোনো সরকারি নথি বা তথ্য নেই, যার ভিত্তিতে সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।

ফজল মিয়া বলেন, ‘আমার মেয়ের ভাগ্যে কী ঘটেছে, আমরা জানি না। সে বেঁচে আছে, না মারা গেছে, তাও জানি না। আমরা শুধু মানুষের কাছে উড়ো খবর শুনেছি।’

চার বছরের মেয়েকে রেখে বিদেশে গিয়েছিলেন সুইটি
সুইটির মা জহুরা জানান, মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। তার চার বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সুইটি সৌদি আরবে যাওয়ার পর শিশুটিকে লালনপালনের জন্য নিজের বড় বোন বিউটির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

মেয়ের পরিণতি জানতে সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন জহুরা। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে জানতে চাই, আমার মেয়ের কী হয়েছে। আমি আমার মেয়েকে ফেরত চাই। জীবিত হোক, মৃত হোক, আমি আমার মেয়েকে চাই।’

সুইটির বিষয়ে সরকারি কোনো তথ্য পাননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মহেরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাস সরকার নুপুর এবং মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন।

পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, সুইটি আদৌ মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়েছেন কি না। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের নথি, বাংলাদেশের দূতাবাসের তথ্য এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সুইটির বিরুদ্ধে কী অভিযোগে মামলা হয়েছিল, বিচার কীভাবে হয়েছে এবং তার পরিবারের সঙ্গে এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *