মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে’

মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলার সময়ও জানতেন না, সেটিই হবে তার জীবনের শেষ আলাপ। সৌদি আরবের কারাগার থেকে বাবাকে ফোন করেছিলেন সুইটি আক্তার। কথা হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু সেই ফোনালাপের দুই দিন পরই পরিবারের কাছে পৌঁছায় মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর। এরপর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের এই পরিবারের সদস্যরা। মেয়েকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন তাদের একটাই আকুতি, সুইটির মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

সুইটি আক্তার জীবিকার তাগিদে প্রায় তিন বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। পেছনে রেখে গিয়েছিলেন ছোট্ট মেয়েকে, অভাবের সংসার আর অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন। বিদেশে গিয়ে উপার্জন করে পরিবারের আর্থিক সংকট কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন সুইটি। এরপর কারাগারে থাকা অবস্থায় পরিবারের সঙ্গে কখনো নিয়মিত, কখনো দীর্ঘ বিরতিতে যোগাযোগ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে থমকে গেছে পরিবারের সব আশা।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে গত ১৪ অক্টোবর এ তথ্য জানায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।

শেষ ফোনালাপেও জানতে পারেননি পরিণতি
সুইটির বাবা মো. ফজল মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় ১৩ অক্টোবর, মঙ্গলবার, মাগরিবের নামাজের পর। ওই সময়ও সুইটি কারাগারে ছিলেন। তবে নিজের বিচার কিংবা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাবাকে কিছু জানাননি তিনি। দুই দিন পর মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানতে পারেন পরিবারের সদস্যরা।

ফজল মিয়া জানান, একটি এজেন্সির মাধ্যমে ২০২৩ সালের মার্চে সৌদি আরবে যান সুইটি। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। বিদেশে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এরপর একদিন ফোন করে কারাগারে বন্দী থাকার কথা জানান মেয়েটি।

সুইটি তখন পরিবারকে বলেছিলেন, তার সঙ্গে কাজ করা কয়েকজন নারী অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছিলেন। এ ঘটনায় তাদের সঙ্গে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর থেকে কারাগারে থাকা অবস্থায় কখনো এক সপ্তাহ, কখনো এক মাস পর পরিবারের সঙ্গে কথা হতো।

এভাবে প্রায় এক বছর চলার পর আবার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর সুইটি ফের ফোন করেন। তখনো কারাগারে থাকার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তবে ফোন করতে না পারলেও পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন। এভাবে আরও প্রায় চার মাস কেটে যায়। এরপর সর্বশেষ ফোনালাপের আগপর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে তার আর যোগাযোগ হয়নি।

মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর ফজল মিয়ার কাছে এখন শেষ ফোনালাপের স্মৃতিই বারবার ফিরে আসছে। যে মেয়ের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিন্ত থাকার চেষ্টা করেছিলেন, তার জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না তিনি।

‘আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও’
সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার একটি গ্রামে। তার বাবা মো. ফজল মিয়া ও মা জহুরা বেগম। পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন সুইটি। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। অভাবের সংসারে বাবার পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলতে হতো।

মঙ্গলবার সকালে সুইটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকজন স্বজন ও প্রতিবেশী জড়ো হয়েছেন। ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন তার মা-বাবা। মেয়ের কথা উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা জহুরা বেগম।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে।’

নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেও বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে মেয়েকে হারানোর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না…আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।’

মেয়ের মৃত্যুর খবরের পর তার মরদেহ একবার দেখার আকুতিই এখন জহুরা বেগমের কথায় বারবার উঠে আসছে।

ভাঙা সংসার, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও বিদেশযাত্রা
সুইটির জীবন শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা ছিল। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। কিন্তু সেই সংসার টেকেনি। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। পরে পরিবারের চাপে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন।

তবে দ্বিতীয় স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। এমন পরিস্থিতিতে মেয়ের ভবিষ্যৎ এবং বাবার সংসারের আর্থিক দুরবস্থা দূর করার কথা ভেবে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সুইটি।

তার চাচাতো বোন সালমা আক্তার জানান, দ্বিতীয় বিয়ের পর ধারদেনা করে সুইটির স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তিনি আর যোগাযোগ রাখেননি। পরে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এক বোনের কাছে মেয়েকে রেখে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সুইটি।

সুইটির মেয়ের বয়স এখন নয় বছর। সে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। মায়ের বিদেশযাত্রার পেছনে এই সন্তানের ভবিষ্যৎও ছিল অন্যতম বিবেচনা। কিন্তু যে উপার্জন দিয়ে মেয়ের জীবন কিছুটা স্বস্তির করতে চেয়েছিলেন সুইটি, সেই প্রবাসজীবনই শেষ পর্যন্ত তার পরিবারের জন্য নিয়ে এসেছে অপূরণীয় শোক।

অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন স্বজনদের
সুইটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছেন না তার পরিবারের সদস্যরা। তাদের ধারণা, তিনি সৌদি আরবে কারও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তবে তাদের এই সন্দেহের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সুইটির বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় উপস্থিত ছিলেন চাচাতো বোন সালমা আক্তার। তিনি বলেন, সুইটি কখনো অন্যায় কাজে জড়াতে পারেন না বলে তাদের বিশ্বাস। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তাকে বিদেশে যেতে হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

সালমার ভাষ্য, সুইটির বাবা কষ্ট করে সংসার চালাতেন। পাঁচ মেয়ের এই পরিবারে কোনো ছেলে সন্তান নেই। অভাবের কারণে সুইটিকে বিদেশে যেতে হয়েছিল। তার পরিণতি এমন হবে জানলে পরিবার কখনো তাকে বিদেশে যেতে দিত না বলেও আক্ষেপ করেন তিনি।

সুইটির বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, মামলার বিস্তারিত কী ছিল এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় কী কী তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল, এসব বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের বাইরে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে স্বজনদের সন্দেহকে অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

মরদেহ ফেরানোর অপেক্ষায় পরিবার
সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরেছে বলে জানিয়েছেন মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম। তবে পরিবারের কাছে মেয়ের মরদেহ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

একদিকে বিদেশের কারাগারে মেয়ের জীবনের শেষ পরিণতি, অন্যদিকে দেশে রেখে যাওয়া নয় বছরের সন্তানকে নিয়ে সুইটির পরিবার এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তার মা-বাবা মেয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করার সুযোগও পাননি। তাই তাদের প্রধান আকুতি, অন্তত মেয়ের মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

অভাবের সংসার থেকে মেয়ের ভবিষ্যৎ বদলানোর আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুইটি আক্তার। কিন্তু তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে সেই পরিবারের সামনে এখন শোক, অনিশ্চয়তা ও অসংখ্য প্রশ্ন। শেষ ফোনালাপের স্মৃতি আর মেয়েকে একবার দেখার আকুতি নিয়েই দিন কাটছে তার মা-বাবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *