বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

সবশেষ

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের মেঘ চুরির অভিযোগ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নতুন ও দাবি ছড়িয়ে পড়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিমান ব্যবহার করে ওই অঞ্চলের ‘মেঘ চুরি’ করছে। এই তত্ত্বের প্রবক্তারা দাবি করছেন, যুদ্ধের কারণে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে বৃষ্টিপাত ফিরে এসেছে। 

ইরাকের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল-খাইকানি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেছেন, প্রতিবেশী ইরান ও তুরস্কও মনে করে যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিমভাবে মেঘ ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তারা আর মেঘ সরাতে পারছে না, যার ফলে ইরাকে দীর্ঘ খরা কাটিয়ে আবার বৃষ্টির দেখা মিলছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এই বিচিত্র দাবির পেছনের বিজ্ঞান ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে।

বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা অবশ্য ‘মেঘ চুরি’র এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবৈজ্ঞানিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ইরাকের আবহাওয়া অধিদপ্তরের মুখপাত্র আমের আল-জাবেরি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে ইরাকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার পূর্বাভাস গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই দেওয়া হয়েছিল, যা যুদ্ধ শুরুর অনেক আগের ঘটনা।

তুরস্কের নেটিজেনদের একাংশও দাবি করছেন, গত ৬৬ বছরের মধ্যে সেখানে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণ হলো যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মেঘ সরানোর সক্ষমতা কমে যাওয়া। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেঘকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো প্রযুক্তি এখনো মানুষের হাতে আসেনি। মূলত জলচক্র ও জলবায়ু ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাবেই এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বিশ্বাসীরা প্রায়ই ‘ক্লাউড সিডিং’ নামক একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে তাঁদের দাবির সপক্ষে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। ক্লাউড সিডিং হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে বিমানের সাহায্যে মেঘের মধ্যে সিলভার আয়োডাইড কণা ছড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা করা হয়। তবে খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডায়ানা ফ্রান্সিস জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিটি কেবল আগে থেকেই থাকা মেঘকে সামান্য ‘ধাক্কা’ দিয়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃষ্টিপাত বাড়াতে পারে, কিন্তু পুরো আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করা এর পক্ষে অসম্ভব।

এছাড়া এক জায়গায় কৃত্রিম বৃষ্টি নামালে পাশের এলাকায় বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়, এমন দাবিরও কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষক ড. জেফ ফ্রেঞ্চ।

আসল সত্য হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে আবহাওয়ার চরমভাবাপন্ন আচরণ দিন দিন বাড়ছে। কয়লা, গ্যাস ও তেল পোড়ানোর ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এই অঞ্চলে বৃষ্টির ধরণ অনিয়মিত হয়ে গেছে। জাতিসংঘের জলবায়ু প্যানেল আইপিসিসি-র মতে, এই অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ, যার ফলে একদিকে তীব্র খরা এবং অন্যদিকে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিতে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. সারা স্মিথ মনে করেন, জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মানুষ অনেক সময় সহজ কিন্তু ভুল ব্যাখ্যা খুঁজে নেয়, যা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়াতে সাহায্য করে। মূলত পানি নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনই এই আবহাওয়াজনিত সংকটের মূল কারণ, কোনো অতিপ্রাকৃত ‘মেঘ চুরি’ নয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *