নেত্রকোনার মদন উপজেলায় এক মাদরাসার পরিচালকের লালসার শিকার হয়ে ১২ বছর বয়সী এক শিশু অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত শিক্ষক ও তার পরিবার পলাতক রয়েছে। এদিকে প্রভাবশালী চক্র ও অভিযুক্তের স্বজনরা ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ব্যর্থ হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা আলাদা থাকেন এবং পরিবারের ভরণপোষণ করেন না। ফলে মা জীবিকার তাগিদে সিলেট গিয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ শুরু করেন। একমাত্র কন্যা সন্তানকে তিনি রেখে গিয়েছিলেন নানার বাড়িতে। দরিদ্র হওয়ায় ধর্মীয় শিক্ষা ও স্বাক্ষর জ্ঞান অর্জনের জন্য শিশুটিকে বাড়ির পাশের ‘হযরত ফাতেমাতুজ জোহুরা মহিলা কওমি মাদরাসা’য় ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেই শিক্ষা অর্জনই শিশুটির জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়।
২০২২ সালে মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের সুতিয়ারপার পাঁচার গ্রামের বড়বাড়ির মসজিদের পাশে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন মৃত শামছুদ্দিন মিয়ার ছেলে আমান উল্লাহ সাগর। তিনি নিজেই এর পরিচালক ছিলেন এবং তার স্ত্রী সেখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন। টিনের দুটি আলাদা ঘরের চারটি কক্ষে শিশুদের পড়ানো হতো। একটি কক্ষের বারান্দায় পর্দা দিয়ে ঘেরা একটি আলাদা বিছানা ছিল, যেখানে গত নভেম্বর মাস থেকে শিশুটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত ধর্ষণ করে আসছিলেন আমান উল্লাহ সাগর।
দীর্ঘদিন পৈশাচিক এই নির্যাতনের শিকার হয়ে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তার পেট ভার হতে শুরু করে। মা কাজের প্রয়োজনে বাইরে থাকায় এবং শিশুটি ভয়ে মুখ বন্ধ রাখায় বিষয়টি শুরুতে বোঝা যায়নি। পরে মা বাড়িতে ফিরে তাকে ময়মনসিংহের এক গাইনি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পর চিকিৎসক ঘটনাটি ধরেন এবং বিষয়টি শুনে হতবাক হয়ে পড়েন। চিকিৎসক রহস্য উন্মোচন করার পরেই এলাকায় বিষয়টি নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত সাগর তার স্বজন ও মাদরাসার অন্য একজন শিক্ষককে নিয়ে ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। তারা দরিদ্র পরিবারটিকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে গত ১৮ এপ্রিল অভিযুক্ত সাগর তার স্ত্রী ও সন্তানসহ পালিয়ে যান। বর্তমানে মাদরাসাটি বন্ধ রয়েছে।
পরবর্তীতে গত ২৩ এপ্রিল ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর এবং মীমাংসাকারীকে আসামি করে মদন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর অন্য এক আসামি আদালতে হাজিরা দিয়ে জামিন নিয়ে তিনিও এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।
সোমবার (৪ মে) মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম সংগীয় ফোর্স নিয়ে ভুক্তভোগী শিশুটির বাড়িতে যান। তিনি পরিবারটিকে আইনি সহায়তা এবং নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। সেই সাথে কোনো ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এই থানায় যোগদানের আগেই মামলাটি হয়েছে এবং মামলার দু-একদিন আগেই আসামি পালিয়েছে। আসামির পক্ষ থেকে মীমাংসার চেষ্টার বিষয়টি আমি শুনেছি। বর্তমানে এলাকায় একটি গুমট পরিস্থিতি বিরাজ করছে; কেউ তথ্য বা ফোন নাম্বার দিয়ে সহযোগিতা করতে চাইছে না। আসামির বাড়িতে তার মাকে পাওয়া গেলেও তিনি দাবি করেছেন যে তার ছেলে কোথায় আছে তা তিনি জানেন না। তবে আমরা যত দ্রুত সম্ভব আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’








