বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

সবশেষ

‘ছাত্রী উইং’ আসছে চরমোনাই পীরের দলে!

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাংগঠনিক বিস্তার বাড়াতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বিশেষ করে নারী ভোটার ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য সামনে রেখে এবার দলটি আলাদা ‘ছাত্রী উইং’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, ঈদুল আজহার পর নতুন এই সংগঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

দলের নেতারা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সক্রিয় উপস্থিতি ছাড়া সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো কঠিন। সেই জায়গা থেকেই ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া, ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব তৈরি এবং তরুণীদের সংগঠিত করতেই এই নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান জানিয়েছেন, নারীদের নিয়ে আগে থেকেই সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সংগঠন করার ভাবনা আগে ছিল না। তবে সময়ের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় এখন পৃথক ছাত্রী সংগঠন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটার ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ইসলামী ধারার রাজনৈতিক দলের সক্রিয়তা নতুনভাবে নজরে এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের মহিলা বিভাগ, ছাত্রী সংস্থা ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়ে সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। ইসলামী আন্দোলনের অভ্যন্তরেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে এককভাবে অংশ নেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। যদিও শুরুতে দলটি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে ছিল, নির্বাচনের আগেই তারা সেই জোট থেকে সরে আসে। নির্বাচনে দলটি মোট ভোটের ২ দশমিক ৭০ শতাংশ পায় এবং একটি আসনে জয়লাভ করে।

দলীয় সূত্র জানায়, ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় ইসলামী আন্দোলনের কোনো নারীভিত্তিক আলাদা ইউনিট ছিল না। তবে গত বছরের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে দলটি প্রথমবারের মতো ৩৪ সদস্যের কেন্দ্রীয় মহিলা ইউনিট ঘোষণা করে। এরপর থেকেই নারীদের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়ে নতুন চিন্তাভাবনা শুরু হয়।

দলের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বর্তমান মহিলা ইউনিটের মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রত্যাশিত মাত্রায় সাংগঠনিক বিস্তার সম্ভব হচ্ছে না। প্রজন্মগত দূরত্ব, সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার্থীদের আলাদা বাস্তবতা, এসব কারণকে সামনে এনে নতুন ছাত্রী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়েছে। নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণেও নারী ভোটারদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সংগঠনের কাঠামো, নেতৃত্ব নির্বাচন ও কার্যক্রম নিয়ে ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় মাসিক সভায় এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। আগামী ১৮ মে নির্ধারিত সভায় এ নিয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।

সংগঠনটির কার্যক্রম কেমন হবে, তা নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা সরাসরি মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে কি না, নাকি মূলত দাওয়াহ, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এসব বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে। পরে দলের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সম্মতির পর বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে শীর্ষ পর্যায়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়।

দলটির নেতারা মনে করছেন, ইসলামপন্থী দলগুলোকে ঘিরে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিনের কিছু নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেই ধারণা বদলানোরও চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোও বড় লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দলীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের আদলে ছাত্রী উইংও মূল দলের নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হবে। আহ্বায়ক, সদস্যসচিব এবং বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রাথমিক কাঠামো গঠন করা হতে পারে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, সংগঠনের নেতৃত্বে আলেমা, চিকিৎসক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশা ও শিক্ষাক্ষেত্র থেকে নারীদের যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি থানা ও শহরভিত্তিক সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সক্রিয় উপস্থিতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

দলটির নেতারা বলছেন, নতুন ছাত্রী সংগঠনকে শুধু রাজনৈতিক কর্মী তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং জ্ঞানচর্চা, দক্ষতা উন্নয়ন, সমাজকল্যাণমূলক কাজ, দাওয়াহ কার্যক্রম এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক সংগঠন গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় নেতাদের মতে, ইসলামী আন্দোলনের সহযোগী সংগঠনগুলো দলীয় নীতিনির্ধারণ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে নতুন ছাত্রী উইংও সেই ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। নির্বাচনী কার্যক্রমেও সংগঠনটির সম্পৃক্ততা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমানের বরাতে বলা হয়েছে, নতুন এই ইউনিটের নিজস্ব গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক নীতিমালা থাকবে, তবে এটি মূল দলের অধীনেই পরিচালিত হবে। তার মতে, এই উদ্যোগ কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়; বরং নারীদের নৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ করে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, নারী ভোটার ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই নতুন সাংগঠনিক উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে দেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন এই ছাত্রী সংগঠন কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নির্ভর করবে তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বাস্তব উপস্থিতির ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *