পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়ে সাবেক তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীর বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যাবর্তনের জন্য নিজের ছেড়ে দেওয়া আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলে এই ঘোষণাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে রাজ্যে ক্ষমতা হারানো ও দলীয় অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হুমায়ুন কবীর বলেন, এবারের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়ী হতে না পারলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি প্রয়োজন। তাই তিনি যদি নিজে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তাহলে রেজিনগর আসনের উপনির্বাচনে তাকে জয়ী করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবেন।
দীর্ঘ দেড় দশক রাজ্য শাসনের পর এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারিয়েছে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস। প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। নতুন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী, যিনি নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন। ফলে বর্তমানে বিধানসভার সদস্য নন সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পাশাপাশি তৃণমূলের ভেতরেও নেতৃত্বসংকটের আভাস দেখা দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনয়ন দিলেও দলের একাংশের বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পান ঋতব্রত চট্টোপাধ্যায়। উল্লেখ্য, ঋতব্রতকে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন মমতা।
এমন পরিস্থিতিতে মমতার বিধানসভায় প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছেন একসময় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন কবীর।
একসময় তৃণমূল সরকারের মন্ত্রী ছিলেন হুমায়ুন। তবে গত বছর মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বাবরি মসজিদ নির্মাণ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পর দলের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। পরে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তিনি ‘আম-জনতা উন্নয়ন পার্টি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
নতুন দলের ব্যানারে এবারের নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও নওদা, দুই আসনেই জয় পান হুমায়ুন কবীর। রেজিনগরে তিনি বিজেপি প্রার্থী বাপন ঘোষকে ৬৪ হাজার ৬৬০ ভোটে এবং নওদায় রানা মণ্ডলকে ২৭ হাজার ৯৪৩ ভোটে পরাজিত করেন। পরে তিনি নওদা আসন রেখে রেজিনগর আসনটি ছেড়ে দেন। ফলে সেখানে উপনির্বাচনের পথ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন। শুভেন্দু ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম আসনে জয়ী হলেও পরে নন্দীগ্রাম আসন ছেড়ে দেন। ফলে সেখানেও উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে হেরে যাওয়ার পর ভবানীপুরের উপনির্বাচনে জিতে বিধানসভায় ফিরেছিলেন মমতা।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবীর বলেন, মমতা যদি তাকে অনুরোধ করেন, তাহলে তিনি তাকে রেজিনগর থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে আনার চেষ্টা করবেন। তার ভাষায়, এটিই হবে সাবেক নেত্রীর প্রতি তার ‘গুরুদক্ষিণা’।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রস্তাবে সাড়া দেবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হুমায়ুন কবীর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশলের সমালোচনা করেন। তার দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই ভাইপো ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা এবার সেই রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে দিয়েছেন এবং তৃণমূলের টানা চতুর্থবার সরকার গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেননি।








