মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সবশেষ

স্টেট ডিফেন্স কী, রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলায় স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের নির্দেশ কেন?

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির পক্ষে শুনানির জন্য স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ মঙ্গলবার এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইংকে একজন ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ আইনজীবীকে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে নিয়োগ দিতে বলা হয়েছে।

তবে এই আদেশের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, মামলায় নিম্ন আদালত ইতোমধ্যে আসামিদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন, সেই মামলায় আবার রাষ্ট্রের খরচে আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজন কেন, আর স্টেট ডিফেন্সই বা কী?

স্টেট ডিফেন্স কী?
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ‘স্টেট ডিফেন্স’ বলতে রাষ্ট্রনিযুক্ত এমন একজন আইনজীবীকে বোঝানো হয়, যিনি আসামির পক্ষে আদালতে আইনি সহায়তা প্রদান করেন। সাধারণত কোনো আসামি নিজে আইনজীবী নিয়োগ করতে না পারলে, আইনজীবী না থাকলে কিংবা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে আদালত প্রয়োজন মনে করলে রাষ্ট্রের খরচে এই আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।

স্টেট ডিফেন্সের কাজ হলো আসামির পক্ষে আইনি যুক্তি উপস্থাপন করা, সাক্ষীদের জেরা করা, মামলার নথিপত্র ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করা এবং আদালতে আসামির আইনগত অধিকার রক্ষা করা।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্র আসামির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বরং রাষ্ট্র নিশ্চিত করে যে, বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তি যেন আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন। কারণ ন্যায়বিচারের অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে।

রামিসা মামলায় স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের নির্দেশ কেন?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ মামলাটি এখন মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন বা ডেথ রেফারেন্স পর্যায়ে রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় কার্যকর হওয়ার আগে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়াকে ডেথ রেফারেন্স বলা হয়। হাইকোর্ট তখন পুরো মামলার নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত পুনরায় পর্যালোচনা করেন।

এই শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের পাশাপাশি আসামিপক্ষেরও যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ থাকতে হয়। কিন্তু কোনো কারণে আসামিদের পক্ষে আইনজীবী না থাকলে বা কার্যকর আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন হলে আদালত স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ করতে পারেন।

অর্থাৎ, রামিসা মামলায় স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের নির্দেশ মূলত ন্যায়বিচারের সাংবিধানিক নীতি অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির মামলায় আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

যে পর্যায়ে রয়েছে মামলাটি
আদালত সূত্রে জানা গেছে, রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের ডেথ রেফারেন্স এবং জেল আপিলের পেপারবুক বিজি প্রেসে মুদ্রণের পর সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছেছে। বর্তমানে সেগুলোর যাচাই-বাছাই চলছে।

পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ায় যেকোনো সময় হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরু হতে পারে। এরই মধ্যে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে, গত ৯ জুন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের স্বাক্ষরের পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছিল।

কী ছিল নিম্ন আদালতের রায়
গত ৭ জুন বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। রায়ে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়। আদালত নির্দেশ দেন, জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী শিশুর আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে যা এসেছে
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, শিশুটিকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল এবং তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আদালত আরও বলেন, আসামি সোহেল রানা স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে সেই জবানবন্দি প্রত্যাহারের কোনো আবেদন করেননি। ফলে অপরাধে তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে।

অন্যদিকে, আদালতের মতে, স্বপ্না আক্তার অপরাধ সংঘটনের পর স্বামীকে পালাতে সহযোগিতা করেছেন এবং অপরাধ প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা রাখেননি। এ বিষয়টিও রায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।

ন্যায়বিচারের স্বার্থেই স্টেট ডিফেন্স
আইনজ্ঞদের ভাষ্য, কোনো মামলার আসামি যত গুরুতর অপরাধেই অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হোন না কেন, বিচারব্যবস্থা তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার দেয়। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ক্ষেত্রে আদালত নিশ্চিত করতে চান যে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ আইনসম্মত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

সে কারণেই রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলায় স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের নির্দেশকে আসামিদের প্রতি সহানুভূতি নয়, বরং ন্যায়বিচারের পূর্ণতা নিশ্চিত করার একটি আইনগত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *