বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন মাদারীপুরের রফিকুল ইসলাম রাব্বি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। ছেলেকে জীবিত ফেরাতে পরিবার ভিটেমাটি বিক্রি করেছে, ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েছে, এমনকি মুক্তিপণ হিসেবে দিয়েছে ৮৫ লাখ টাকা। তবুও এক সপ্তাহ ধরে রাব্বির কোনো খোঁজ মিলছে না। আর নির্যাতনের ভিডিও দেখে শোক সহ্য করতে না পেরে ইতোমধ্যে মারা গেছেন তার বাবা ও মা।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) মাদারীপুর সদর উপজেলার মধ্য খাগদী এলাকায় রাব্বির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোক আর উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে আছে পুরো পরিবেশ। স্বজনদের চোখে-মুখে একটাই প্রশ্ন, রাব্বি বেঁচে আছেন তো?
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন রাব্বি। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় বিদেশযাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ইতালিতে পৌঁছানোর বদলে তাকে লিবিয়ায় আটকে ফেলে একটি চক্র। সেখানে নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
পরবর্তীতে নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হয় স্বজনদের কাছে। সেই ভিডিও দেখার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন রাব্বির বাবা জলিল বেপারী। প্রায় দেড় বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। ছেলের জন্য উদ্বেগ ও শোকের মধ্যেই ছয় মাস আগে মারা যান মা মেহেরুন নেছাও।
স্বজনদের দাবি, এরপরও থামেনি মুক্তিপণের চাপ। কয়েক দফায় মোট ৮৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে পরিবারের কাছ থেকে। কিন্তু এত টাকা দেওয়ার পরও রাব্বির মুক্তি মেলেনি। বরং গত এক সপ্তাহ ধরে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
রাব্বির পরিবার অভিযোগ করেছে, সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের তালতলা এলাকার আয়ুব আলী মাতুব্বরের ছেলে রিয়াজুল মাতুব্বর, তার শ্বশুর মধ্য খাগদী এলাকার জামাল ফকির এবং শাশুড়ি রোমানা বেগমের সঙ্গে বিদেশ পাঠানোর বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
রাব্বির খোঁজ না পেয়ে মঙ্গলবার দুপুরে অভিযুক্তদের বাড়িতে যান পরিবারের সদস্যরা। তবে সেখানে গিয়েও কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাননি বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রাব্বি সবার ছোট। তাকে বিদেশ পাঠাতে পরিবার ভিটেমাটি বিক্রি করেছে, পাশাপাশি উচ্চ সুদে ঋণও নিয়েছে। এখন একদিকে পাওনাদারদের চাপ, অন্যদিকে ছেলের কোনো খোঁজ না থাকায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে পরিবারটির।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই জড়িত একটি চক্র। স্থানীয়দের দাবি, এসব অর্থে অভিযুক্তরা নিজ এলাকায় এবং শ্বশুরবাড়িতেও ভবন নির্মাণ করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন তারা।
রাব্বির বড় বোন তানজিলা আক্তার বলেন, আমার ভাইকে জিম্মি করে মোট ৮৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দালাল চক্র। আমরা তাদের বিচার চাই এবং আমার ভাইকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর বেপারী বলেন, রিয়াজুল দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণা করে আসছে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন অপরাধ করতে সাহস না পায়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন অভিযুক্ত রোমানা বেগম। তিনি বলেন, রফিকুল ইসলাম রাব্বি কার মাধ্যমে বা কখন বিদেশে গেছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। অর্থ লেনদেনের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার দাবি, জামাতা রিয়াজুল মাতুব্বর বর্তমানে ইতালিতে অবস্থান করছেন এবং তার স্বামী কর্মসূত্রে কালকিনি উপজেলায় রয়েছেন।
এ বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারিহা রফিক ভাবনা বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশ।








